চলুন ঘুরে আসি জেলার প্রাচীন জনপদ রায়গঞ্জে

May 2, 2011
By

ঘুরে এলাম তিস্তা নদীর পলল ভূমি, যমুনা বিধৌত সিরাজগঞ্জ জেলার সুপ্রাচীন জনপদ রায়গঞ্জে। সবুজ চাদরে ঢাঁকা শস্য-শ্যামল রায়গঞ্জ খাদ্যশস্য উৎপাদনে উদ্বৃত্ত এলাকা। সাহিত্য-সংস্কৃতিতেও এমাটির সন্তানেরা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমহিমায় দীপ্যমান। প্রায় তিন হাজার বছরের ইতিহাস ঐতিহ্যের ধারক-বাহক এর মাটি, প্রকৃতি; আকাশ-বাতাস। উপজেলাটির নানা স্থানে ছড়িয়ে রয়েছে ভারতবর্ষের প্রাচীন ইতিহাস খ্যাত বিরাট রাজার রাজ মহলসহ বারো জমিদারের প্রাসাদ এবং তাদের বিভিন্ন স্থাপনার চিহ্ন ।

নামকরণ
রায়গঞ্জের নামকরণ নিয়ে রয়েছে নানা মত। অধিকাংশ ঐতিহাসিকদের মতে এখানকার প্রাচীন ও প্রতাপশালী জমিদার হরিদাস গুহ রায়ঠাকুরের নাম অনুসারে এই এলাকার নাম করণ করা হয় রায়গঞ্জ। অপরদিকে কোন কোন ঐতিহাসিকের মতে পার্শ্ববতী তাড়াশের রায়বাহাদুর জমিদারদের এখানে গঞ্জ (মোকাম) ছিল জন্য স্থানটির নাম হয় রায়গঞ্জ। পুরাকালে এ অঞ্চলে হিন্দু জমিদারদের ছিল অত্যধিক প্রভাব। হিন্দু বসতি ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। ফলে এলাকার অধিকাংশ গ্রাম মহলার নাম হয়েছিল হিন্দুদের দেব-দেবীর নামানুসারে। হিন্দু জমিদারদের মধ্যে অনেকেই ছিল অত্যাচারী ও চরম মুসলিম বিদ্বেষী। একারণে এই এলাকায় মহান ইসলাম প্রচারের জন্য আগত সাধক মহাপুরুষদের সঙ্গে  প্রভাবশালী অত্যাচারী জমিদারদের লড়াই সংগ্রামের অনেক ঘটনা ঘটে। অন্যায়-জুলুমের বিরুদ্ধে তাঁদের লড়াই সংগ্রামের অনেক কাহিনী এলাকাবাসীর এখনো মুখে মুখে।

দর্শনীয় স্থান
এখানে দর্শনীয় স্থান সমূহের মধ্যে রয়েছে, উত্তরবঙ্গ খ্যাত ১৭৪বিঘা জলাবিশিষ্ট জয়সাগর দীঘি। এর অবস্থান উপজেলার  সোনাখাড়া ইউনিয়নের নিমগাছী বাজারের ১কিলোমিটার পশ্চিমে। পাল-সাম্রাজ্যের রাজা দ্বিতীয় গোপাল পাল (৯৪০-৯৬০খ্রীঃ) তার শাসন আমলে প্রজা ও গবাদি পশুর জলকষ্ট নিবারনের জন্য এই দীঘি খনন করেন।
রাজা দ্বিতীয় গোপাল পালের শাসনামলেই স্থাপিত হয় স্থাপত্য শিল্পের সহস্রাব্দের অমরকীর্তি হাটিকুমরুল নবরতœ মন্দির। ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটি এককালে পুরাতন রায়গঞ্জ থানার অন্তর্ভূক্ত থাকলেও এখন এর অবস্থান রায়গঞ্জের সীমান্তবর্তী উল্লাপাড়া উপজেলার হাটিকুমরুল ইউনিয়ন পরিষদের অদুরে উত্তরবঙ্গ মহাসড়কের প্রায় দেড় কিলোমিটার পূর্বপার্শ্বে।
পাল রাজা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী হলেও তার আমলে এলাকায় শিব, দুর্গা মন্দির ও মসজিদসহ জনস্বার্থে বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে ওঠে।  প্রাচীন ঐতিহ্য-কীর্তির মধ্যে রয়েছে ধানগড়া সদরে মোঘল আমলের তিন গম্বুজ মসজিদ যা মজমবাড়ির মসজিদ নামে পরিচিত। মসজিদটি জঙ্গলাকীর্ণ পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে।  কোন কোন ঐতিহাসিকের মতে সেন বংশের রাজা অচ্যূত সেন এই জয়সাগার সহ আরো ২টি দীঘি খনন করেন। এছাড়াও রায়গঞ্জ এলাকায় ছড়িয়ে রয়েছে অনেক বৌদ্ধমঠসহ অসংখ্য প্রাচীনকীর্তির স্মৃতিচিহ্ন।

আমরা ঘুরে দেখলাম ধামাইনগর ইউনিয়নে রয়েছে ২টি পুরাকীর্তি, প্রতাপদীঘি ও বিরাট রাজারবাড়ির ধ্বংসাবশেষ (ীরতলা বুরুজ)। সোনাখাড়া ইউনিয়নে ৩টি, অর্জুণগড় মন্দির ও আশ্রম, নিমগাছি ভোলা দেওয়ান(রহঃ) এর মাজার ও মসজিদ এবং জয়সাগর দীঘি। ধুবিল ইউনিয়নে-১টি, ধুবিল কাটারমহল জমিদার বাড়ি (মুন্সিবাড়ি), চান্দাইকোনা ইউনিয়ন-৩টি, সিমলা হরিবাড়ি, কোদলা চারআনী জমিদার বাড়ির মঠ, চান্দাইকোনা পুর্বপাড়া জমিদার বাড়ি ও দুর্গামন্দির (পরিত্যক্ত) এর ধ্বংসাবশেষ। ধানগড়া ইউনিয়নে ৫টি, মকিমপুর জমিদারবাড়ি, বাশুড়িয়া বুড়া দেওয়ান (রহঃ) এর মাজার, আটঘরিয়া জমিদার বাড়ি, ধানগড়া মজমবাড়ির মসজিদ, রায়গঞ্জ সান্যাল জমিদারবাড়ি। পাঙ্গাসী ইউনিয়নে ২টি, বেঙনাই বাল্লাপীরের মাজার ও গ্রাম পাঙ্গাসী বাজারে শাহ সুলতান (রহঃ) এর মাজার। ব্রহ্মগাছা ইউনিয়ন-২টি, বাড়ইভাগ কালীবাড়ি ও কয়ড়া কালীবাড়ির ভিটা।

সোনাখাড়া ইউনিয়নের নিমগাছি বাজারের পশ্চিম পাশে জামে মসজিদের পিছনেই ভোলা দেওয়ানের (রহঃ) মাজার। কথিত আছে মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) এর বিদায় ভাষণের ময়দানে উপস্থিত সাহাবীদের মধ্যে তিনি একজন সাহাবী। ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে তিনি এ অঞ্চলে আগমন করেন।

প্রাচীন রায়গঞ্জ থানার (১৮৪০খৃঃ) অর্ন্তগত বর্তমান বগুড়ার জেলার শেরপুর উপজেলার সিংহের সিমলা গ্রামে রয়েছে রায়গঞ্জ নামকরণে প্রতিষ্ঠাতা জমিদার হরিদাস গুহরায় ঠাকুরের শিব-দুর্গা মন্দির ও রাজপ্রাসাদের ভগ্নাবশেষ। রায়গঞ্জের পার্শ্ববর্তী তাড়াশ উপজেলার নওগাঁয় (নবগ্রাম) দাদাপীর হযরত শাহ শরীফ জেন্দানী (রহঃ)’র মাজার ও মসজিদ অবস্থিত। তাঁর নামে এখানে স্থাপিত হয়েছে শাহ শরীফ জিন্দানী (রহঃ) ডিগ্রী কলেজ। প্রতি বছর এখানে চৈত্র মাসের প্রথম সপ্তাহে তিন দিনব্যাপী ওরশ হয়। এঁরা সকলেই এই এলাকায় মহান ইসলাম প্রচারের জন্য আগমন করেন।

এখানে ১৯৭১ সালের ১১নভেম্বর পলাশ ডাঙ্গা যুব শিবির নেতা প্রয়াত আব্দুল লতিফ মির্জার নেতৃত্বে সংঘটিত হয় পাক বাহিনীর সাথে মুক্তি বাহিনীর ৮ঘণ্টাব্যাপী সম্মুখ যুদ্ধ। গতবছর (২০০৯খৃঃ) ১১নভেম্বের উত্তরবঙ্গের সহাস্রাধিক মুক্তিযোদ্ধা ৩৮বছর পর এখানে সমবেত হন। স্বাধীনতাযুদ্ধের ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসাবে ঐদিন এখানে স্থাপন করা হয় বিজয়স্তম্ভ।

উপজেলার ধামাইনগর ইউনিয়নের ীরতলা নামক স্থানে বিরাট রাজার রাজমহল অবস্থিত। এস্থানের নাম ীরতলা কেন বা কবে হয়েছিল তা কেউ বলতে পারে না। তবে ঐতিহাসিকগণের মতে ‘বিরাট নগর’ ছিল এর প্রাচীন নাম- মৎস্যদেশ অধিপতি বিরাট রাজার রাজধানী। এক কালের আলোকজ্জ্বল নগরী ‘বিরাট নগর’ এখন জঙ্গলাকীর্ণ পরিত্যক্ত ভূতুরে এলাকায় পরিণত হয়েছে।
 যেখানে এক সময় ছিল হাজারো ঝাড়বাতির রোশনাই, আনন্দ-বিনোদন, উজ্জ্বল-উচ্ছল জীবন নাটকের ঝলমলে রঙ্গমঞ্চ। সৌর দীপ্তিময় মানব মানবীর জীবন বিচিত্রনের নানা রঙ নানা সৌরভ। সত্য-ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা সংগ্রামের ইতিহাস-স্মৃতি এই মাটি এখনো বহন করছে। রায়গঞ্জে পুরাকালে অনেক বৌদ্ধ মঠ ও বিহার ছিল। এখন এসব স্থাপনার সিংহভাগেরই চিহ্ন নেই। রায়গঞ্জের প্রাচীন এলাকার লালমাটির সঙ্গে মিশে গেছে সেসব স্থাপনার পোড়া মাটি আর ইট সুরকির কণা।

বিরাট রাজার দরবার গৃহ ছিল ঐস্থান থেকে প্রায় ৪ কি: মি: দক্ষিণ-পশ্চিমে নিমগাছীতে (বর্তমান নিমগাছী বাজার) উপজেলা সদর থেকে ধামাইনগর ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয় ২২ কি: মি: দুরত্বে অবস্থিত। পরিষদ কার্যালয়ে যাওয়ার পথে প্রায় ৪ কি: মি: আগেই ধামাইনগর বাজার। এ বাজারের পুর্বপাশ দিয়ে দক্ষিণ দিকে চলে গেছে ধামাইনগর-নিমগাছী সড়ক (এলাকার প্রাচীনতম রাস্তা। এই সড়ক পথে প্রায় ২ কি: মি: পথ অতিক্রম করলেই  ীরতলা। যেখানে প্রায় ৩০ বিঘা জায়গা জুড়ে বিরাট রাজার পোড়ো রাজমহল অবস্থিত। এলাকার মধ্যে সবচেয়ে উঁচু স্থান হিসাবেই এর নাম বুরুজ হিসাবে খ্যাত।

মহাভারতে উলেখিত পঞ্চপান্ডবÑযুধিষ্টির, অর্জুন, ভীম, নকুল ও সহদেব কুরুত্রে যুদ্ধের আগে শক্তি সঞ্চয়ের নিমিত্ত ছদ্মবেশে সপরিবারে বিরাট রাজার আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন। অধিকাংশ ঐতিহাসিকদের মতে খৃষ্টপুর্ব ৩০০ অব্দের দিকে মহাঋৃষি  বেদব্যাস সংস্কৃত ভাষায় এই কাহিনী লিপিবদ্ধ করেন। পরে কাশীরাম দাস ‘কাশীদাসী মহাভারত’ রূপে কাব্য ছন্দে বাংলা ভাষায় এই কাহিনী রচনা করেন। এর ঘটমানকাল সম্ভবত আরও কয়েকশ’বছর আগে গৌতম বুদ্ধের আবির্ভাবের কিছুকাল পুর্বে (গৌতম বুদ্ধের জš§ খৃষ্টপুর্ব ৫৬৭অব্দে, দেহত্যাগ-৪৮৭ অব্দে) ।

জানা যায়, বুদ্ধদেব যখন বৌদ্ধধর্ম প্রচার করছিলেন তখন হস্তিনাপুরে পা-ব বংশের রাজত্ব চলছিল। মহাভারত সূত্র ও ঐতিহাসিকদের মতে বিরাট রাজার শাসনামলে এ রাজ্যের নাম ছিল মৎস্যদেশ। মহাভারতে বিরাট পর্বে আদি জনপদের অনেক কাহিনী জানা যায় ।

বিরাট নগরের রয়েছে আরও একটি স্বর্ণোজ্জ্বল ইতিহাস। কৃষক বিদ্রোহ তথা ফকির বিদ্রোহের অন্যতম নেতা ফকির মজনু শাহ (১৭৭০-১৭৭৪ খৃঃ) সুরতি গোপন আস্তানা গড়ে তুলেছিলেন বিরাট নগরের এই পোড়ো রাজমহলে। তখন প্রাসাদগুলো মাটির গভীরে এতটা প্রোথিত হয়নি। গভীর জঙ্গলাকীর্ণ ও বন্যামুক্ত দ্বীপের ন্যায় ঐ স্থানটির চারিদিক ছিল জলরাশি পরিবেষ্টিত। এখান থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রশিক্ষণ দিয়ে বৃটিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে ৪ বছরের অধিককাল যুদ্ধ পরিচালনা করেন ফকির মজনু শাহ্। ১৭৭১ সালে ফকির মজনু শাহ্’র অধিনস্ত বিদ্রোহীরা বৃটিশ পরে তল্পিবাহক ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার জমিদার মহারাজ চন্দ্র শেখর আচার্যকে বন্দী করে এনে ঐ বিরাট রাজ-মহলের ধ্বংসাবশেষের  গোপন কুঠিতে কিছুদিন আটক করে রেখেছিলেন।

বুরুজের শীর্ষে জš§ নেওয়া বিশাল পাকুড় গাছের শিকড়ের ফাঁকে ফাঁকে দেখা যায়, ধ্বংসপ্রাপ্ত রাজপ্রাসাদের নক্সা খচিত কার্ণিশ। স্থানীয় কতিপয় দুর্বৃত্ত গুপ্তধনের আশায় খোঁড়াখুড়ি করে এর বিপুল পরিমাণ ইট চুরি করে নিয়ে  গেছে। গুজব আছে স্বর্ণমুদ্রাসহ অনেকেই পেয়েছে অত্যাশ্চর্য অনেক কিছু। সংরক্ষণের অভাবে এর স্মৃতিচিহ্ন এখন বিলীন হওয়ার পথে। প্রায় তিন হাজার বছরের প্রাচীন রাজমহলটি কালক্রমে মাটির গভীরে দেবে গেছে। এই বুরুজ থেকে প্রায় ১কিঃমিঃ দক্ষিণ অর্জুণগড় নামক আর এক উঁচু টিলা রয়েছে। এখানে ছিল বিরাট রাজার নর্তকীদের নৃত্যশালা। ছদ্মবেশে আশ্রিত অর্জুন সেখানে নৃত্য-গীতের শিক্ষক হিসাবে নিয়োজিত ছিলেন। পরবর্তীকালে তার নামানুসারে ঐস্থানের নাম হয় অর্জুনগড়। দীর্ঘকাল পরে জমিদার নবীন কিশোর চৌধুরী ঐস্থানে জয়দুর্গা মন্দিরসহ একটি আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন। 
সেবাইত হিসাবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন সরোজুবালা চৌধুরানী। অর্জুনগড়ে এখনও আশ্রমটি বিদ্যমান। আশ্রমের প্রায় ৩০ বিঘা জায়গাসহ কয়েকটি জলাশয় বেখল হয়ে গেছে। ধামাইনগর-নিমগাছি সড়ক লাগোয়া বিশাল এলাকার মধ্যস্থলের এই আশ্রমটির সংস্কার এবং এই স্থানের মনোরম জায়গা ও জলাশয়গুলো উদ্ধার করে কিছু ভবন নির্মাণ করলে এটা হতে পারে পর্যটকদের পছন্দ সই বিশ্রাম কেন্দ্র।

প্রতœতত্ব বিভাগের মাধ্যমে এখানে খনন করা হলে মিলতে পারে ঐতিহাসক প্রামাণ্য অনেক উপকরণ তথা প্রাচীন যুগের ব্যবহার্য সামগ্রীসহ মহা-মূল্যবান সম্পদ। স্থানটির পরিচর্যা সংরক্ষণ ও জাদুঘর নির্মাণসহ ‘স্টুরিস্ট স্পট’ করা হলে সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় অর্জন ও প্রাচীন কীতিটির ঐতিহ্য রক্ষা পেতে পারে বলে বিজ্ঞ মহলের ধারণা।

রায়গঞ্জে ভ্রমণের পর্বটি ছিল রোমন্টিক ও অজানাকে জানায় আনন্দপুর্ণ। কথা হয় সমৃদ্ধ গ্রাম চান্দাইকোনার কবিশেখর ডাঃ আজিজুর রহমান ফিরোজী, চান্দাইকোনা ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ রায়গঞ্জ লেখক বহুমুখী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুহাঃ শামসুল হক, ধানগড়া মহিলা কলেজের জীববিজ্ঞানের প্রভাষক শহীদুল ইসলাম ও অনেক সাহিত্যমোদী ইতিহাস চর্চায় নিয়োজিত গুণীজনদের সঙ্গে।

তাদের অকৃপণ সহযোগিতায় পাওয়া গেল বরেন্দ্র অঞ্চলের ইতিহাস নামের একটি অসাধারণ সমৃদ্ধ গ্রন্থ। এই গ্রন্থের চলনবিলের ইতিকথায় প্রয়াত অধ্যাপক এম এ হামিদ সাহেবের লেখায় জানা গেল, সিরাজগঞ্জ জেলার প্রায় ৩০.৫৯ কি: মি: (১৯ মাইল) পশ্চিমে অবস্থিত ফুলজোড়, ইছামতি ও করতোয়া নদী বিধৌত পলি ও প্রাচীন গৌরবর্ণের (লালমাটি)মাটিতে অবস্থিত একটি পুরাতন থানা রায়গঞ্জ। ১৮৪০খৃষ্টাব্দে প্রথম বগুড়া জেলার থানা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮৪০সালের ৯জুন হতে ১৮৫৭সালের ১৩ জানুয়ারী পর্যন্ত বগুড়া জেলার অর্ন্তভূক্ত ছিল।
১৮৫৭ খৃষ্টাব্দের ১৫ জানুয়ারি রায়গঞ্জ থানা বৃহত্তর পাবনা জেলার সিরাজগঞ্জ মহুকুমার অন্তর্ভূক্ত হয়। রায়গঞ্জ থানার আয়তন ১১৩ বর্গমাইল (১৮১৯৩ কি:মি। ইউনিয়ন ৯টি, গ্রাম ২৫৭টি। এই থানার উত্তরাংশ অপেক্ষাকৃত উচু ও দক্ষিণ অঞ্চল নিম্নভূমি।

এককালে রায়গঞ্জহাট বা মোকাম কাপড়ের ব্যবসার জন্য প্রসিদ্ধ ছিল। এ কারণে কাপড়িয়া রায়গঞ্জ নামেও ছিল এর খ্যাতি। পাবনা জেলার রায়গঞ্জ ও চাটমোহর থানা অতি প্রাচীন থানা। পরে রায়গঞ্জের অংশ বিশেষ নিয়ে তাড়াশ ও চাটমোহরের অংশ বিশেষ নিয়ে ভাংগুরা থানা প্রতিষ্ঠিত হয়। রায়গঞ্জে ইংরেজ, ফরাসি, ওলন্দাজ বণিকগণ বস্ত্র ব্যবসার্থে আগমণ করতেন। এখানকার অধিকাংশ লোক চরকায় সূতা কেটে কার্পাস ও পাটবস্ত্র তৈরি করতো। কোম্পানির কর্মচারীরা টাকা দাদন দিয়ে তাঁতের কাপড় তৈরি করে নিতেন।

এখানকার বর্তমান রফতানিযোগ্য পণ্য হচ্ছে, গুড়, ধান, পাট, সরিষা, শাক-সবজি, শীতলপাটি, তাঁতের ধুতি, শাড়ি, লুঙ্গি, গামছা, বাঁশ বেতের তৈরি সামগ্রী ও চামড়া।
রাজধানী ঢাকা থেকে ঢাকা হতে রায়গঞ্জের দুরত্ব সড়কপথে ১৭৬ কি: মি:, নদীপথে ২১৪ কি: মি:, রাজশাহী বিভাগীয় শহর হতে সড়কপথে ১২৮ কি: মি:, নদীপথে ১৬৮.০৫ কি: মি:, সিরাজগঞ্জ জেলা শহর হতে সড়ক পথে ৪৪ কি: মি:, নদীপথে ৬৩.০৫ কি: মি:, যমুনা বহুমুখী সেতু হতে সড়ক পথে ৪৯ কি: মি:, নদীপথে ৫৩.০৫ কি: মি:, নগরবাড়ি নৌ-বন্দর হতে সড়ক পথে ৭৮ কি: মি:, নদীপথে ৭৫ কি: মি:, বাঘাবাড়ি নৌ-বন্দর হতে সড়কপথে ৫০.০৫ কি: মি:, নদীপথে ৪৬ কি: মি:। এখন সড়ক পথই সুগম।

ভ্রমণ পিয়াসীদের রায়গঞ্জে সাশ্রয়ী ও সাচ্ছন্দে থাকার খাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। নিরিবিলি পরিবেশে এখানে রয়েছে দুটি ডাক বাংলো। একটি ঐতিহাসিক ঐতিহ্যম-িত সলঙ্গা হাটের প্রবেশ মুখে সলঙ্গা ডিগ্রি কলেজের পশ্চিম পাশে অবস্থিত। অপরটির অবস্থান রায়গঞ্জ উপজেলা সদরের প্রায় ১কিলোমিটার দুরে ফুলজোড় নদীর পশ্চিম তীর ঘেঁষে নিরিবিলি সবুজ বনানী বেষ্টিত মনোরম স্থানে। এছাড়াও উত্তরবঙ্গ মহাসড়ক সংলগ্ন থ্রি-স্টার মানের রয়েছে দুটি প্রাইভেট হোটেল।

রায়গঞ্জের ডাকবাংলো থেকে সড়ক পথে ধামাইনগর ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ের দুরত্ব প্রায় ২১ কি: মি:, সোনাখাড়া ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয় ১৭ কি: মি:, ধুবিল ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয় ২৩ কি: মি:, ঘুড়কা ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয় ১৫ কি: মি:, চান্দাইকোনা ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয় ৬ কি: মি:, ধানগড়া ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয় প্রায় ৫ কি: মি:, নলকা ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয় ২৭ কি: মি:, পাঙ্গাসী ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয় ১৭ কি: মি: ও ব্রহ্মগাছা ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয় ১৬ কি: মি:। এসকল ইউনিয়ন এলাকায় ভ্রমন করতে বাহক হিসাবে সুলভে পাওয়া যাবে সিএনজি চালিত মিনিবাস, অটোরিক্সা, রিকসা ও অন্যান্য যানবাহন। ব্যক্তিগত মোটর গাড়ি হতে পারে এই এলাকায় ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে আনন্দদায়ক বাহন।
 (লেখাটি স্যামহোয়ার ইন ব্লগ  থেকে নেওয়া। লেখকের ছদ্মনাম ‘পাখির মতো মন’)



প্রিয় সুহৃদ, সিরাজগঞ্জ বার্তা ডট কম এর পক্ষ থেকে সবাইকে বাংলা নববর্ষের শুভেচ্ছা। যমুনা বিধৌত সিরাজগঞ্জকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে আমাদের এই ছোট্ট প্রয়াস। সিরাজগঞ্জের প্রথম অনলাইন পত্রিকা হিসাবে আমরা সব সময়ই চেষ্টা করবো দেশ-বিদেশের পাঠককে এলাকার গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো দ্রুত পৌঁছে দিতে। সবার সহযোগিতায় আমরা এগিয়ে যেতে চাই যোজন যোজন দূর। -প্রধান সম্পাদক