এক নজরে সিরাজগঞ্জ

সিরাজগঞ্জ মধ্য বাংলাদেশে অবস্থিত একটি শহর। এটি ব্রহ্মপুত্র নদীর পশ্চিম তীরে, এবং ঢাকা শহর হতে প্রায় ১১০ কিলোমিটার (৭০ মাইল) উত্তর পশ্চিমে অবস্থিত। শহরটি সিরাজগঞ্জ জেলার প্রধান শহর। এখানে ১৫টি ওয়ার্ড এবং ৫২টি মহল্লা রয়েছে। ২০০১ সালের আদম শুমারি অনুযায়ী এর জনসংখ্যা ১২,৭১৪।

সিরাজগঞ্জ শহরকে এক সময় কলকাতা ও নারায়ণগঞ্জ এর সমতুল্য পাট ব্যবসায় কেন্দ্র হিসাবে গণ্য করা হত। বর্তমান কালেও এটি পাট ব্যবসায়ের একটি প্রধান কেন্দ্র, এবং সড়ক, রেল ও নৌপথে দেশের অন্যান্য অংশের সাথে যুক্ত। এখানকার পাট কল গুলি তদানিন্তন বাংলা প্রদেশের প্রথম দিককার পাট কলের মধ্যে পড়ে।
সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসনিক বিভাগ রাজশাহী
আয়তন (বর্গ কিমি) ২,৪৯৭
জনসংখ্যা মোট: ২৭,০৭,০১১
পুরুষ: ৫১.১৪%
মহিলা: ৪৮.৮৬%
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা: বিশ্ববিদ্যালয়: ০
কলেজ : ৯০
মাধ্যমিক বিদ্যালয়: ২৪৮
মাদ্রাসা : ২৪৯
শিক্ষার হার ২৭.০ %
বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব যাদব চন্দ্র চক্রবর্তী
প্রধান শস্য ধান, পাট, গম
রপ্তানী পণ্য পাট ও পাটজাত দ্রব্য, গুড়, তাঁত বস্ত্র

অবস্থান
২৪’২২ ও ২৪’৩৭ উত্তর অক্ষাংশ এবং ৮৯’৩৬ ও ৮৯’৪৭ দ্রাঘিমা এর মধ্যে সিরাজগঞ্জের অবস্থান। রাজধানী ঢাকা থেকে এর দূরত্ব ১৪২ কিমি।

ভৌগলিক সীমানা
সিরাজগঞ্জ জেলার উত্তরে বগুড়া জেলা, দক্ষিণে পাবনা জেলা, পূর্বে টাঙ্গাইল ও জামালপুর জেলা ও যমুনা নদী এবং পশ্চিমে নাটোর জেলা অবস্থিত।

প্রশাসনিক এলাকাসমূহ
সিরাজগঞ্জকে জেলায় উন্নীত করা হ্য় ১লা এপ্রিল, ১৯৮৪ সালে। সিরাজগঞ্জের জেলা ৯টি উপজেলায় বিভক্ত। এ গুলো হল বেলকুচি, কামারখন্দ, চৌহালি, কাজীপুর, রায়গঞ্জ, শাহজাদপুর, সিরাজগঞ্জ সদর, তাড়াস, এবং উল্লাপাড়া।

চিত্তাকর্ষক স্থান
যমুনা সেতুর পাড়, সায়েদাবাদ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কুটিবাড়ী, শাহজাদপুর। এনায়েতপুরী পীর সাহেবের মাজার এবং মসজিদ, চৌহালি। শিব মন্দির, তারাশ। নবরত্ন মন্দির, উল্লাপাড়া। মেযমুনা নদীর পাড়, যাকে সবাই বলে গ্রোইন আনেকেই বলে টাইটনিক স্কয়ার, সিরাজগঞ্জ সদর। ইলিওট ব্রীজ যা লোহার ব্রীজ বা বড় পুল নামে পরিচিত, সিরাজগঞ্জ সদর। সিরাজগঞ্জ সরকারী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, সিরাজগঞ্জ সদর। কওমি জুটমিল, সিরাজগঞ্জ সদর

বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গ
* সাবেক মন্ত্রী এম মনসুর আলী
* ড: আবদুল্লাহ আল মুতী শরফুদ্দিন
* কবি মহাদেব সাহা
* ফজলে লোহানী
* সুচিত্রা সেন

ভাষা ও সংস্কৃতি

সাহিত্য ও সংস্কৃতি চেতনার বহিঃপ্রকাশ। এই প্রকাশ নানাভাবে নানা খাতে প্রবাহিত হয়। সাহিত্য সংস্কৃতির ধারা একদিনে গড়ে উঠে না। যুগ-যুগামত্মরের মিলন ও একাত্মতা একে সার্থক ও সমম্বিয়ত করে। বিভিন্ন জেলা ও মহকুমায় তা লক্ষ্য করা যায়। সাহিত্যের ক্ষেত্রে সিরাজগঞ্জের সম্পর্ক রংপুর, বগুড়া, পাবনা সদর, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, যশোর ও খুলনার সংগে। যাতায়াত ও ব্যবসা বাণিজ্য জনিত কারনেই এই যোগাযোগ চলছে বা চলে আসছে। অধুনা রাজশাহী ও নবাবগঞ্জের সাথে রেল সংযোগ থাকায় যোগাযোগ সম্ভব হচ্ছে। রংপুর, বগুড়া, পাবনা ও কুষ্টিয়ার লোক সাহিত্য, ফকিরী, মুর্শিদী, মারফতী গান-গজল, লোক কাহিনী প্রভৃতির মধ্যে একটা স্বতন্ত্র ভাব লক্ষ্য করা যায়। এই স্বতন্ত্রতা বরেন্দ্রভূমি রাজশাহী-নাটোরের প্রভাবমুক্ত। এই ভাবধারা পাশাপাশি চলে আসছে যুগ যুগ ধরে। রংপুর, বগুড়া, পাবনা, কুষ্টিয়া বলয়ের সাহিত্য সংস্কৃতি ভিন্ন গতিপ্রকৃতি বিশিষ্ট, ইসলামী চিমত্মা ধারার প্রতিফলন এতে বেশী স্পষ্টতর হয়। সাহিত্য, সংস্কৃতির এই প্রবাহ যদিও তর্কাতীত নয়, তবু দৃশ্যমান ও প্রকট স্বতন্ত্র ও বৈশিষ্ট্য স্বীকার্য সত্যরূপে প্রতীয়মান। সাদৃশ্য-বৈসাদৃশ্যের মধেই সম্বনয় সাধন প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে ও থাকা দরকার। সিরাজগঞ্জের নাটকের স্থান পূর্ব থেকেই উন্নত, এখনও এখানে নাটক, যাত্রা অভিনীত হয় বেশী। কলিকাতার বিখ্যাত নটরাজ ছবি বিশ্বাসের বাড়ী সিরাজগঞ্জ থানার বাগবাটি গ্রামে ছিল। প্রখ্যাত আইনজীবি অমিত্মম বাবু ছিলেন নাটক প্রিয়। এখনও বহু নাট্যকার বর্তমান। পূর্বের নাট্যশালা এখন পৌর মিলনায়তনে পরিবর্তিত হয়েছে। এখানেও নাটক মঞ্চস্থ হয়। অন্যান্য স্থানের মত সিরাজগঞ্জের কবিতা চর্চা অনেক বেশী। যখনই কোন পর্ব আসে, তখন কবিতার ঢল নামে। এখন ছন্দের প্রতি অনুরাগ নাই। আধুনিক কবিতার প্রতি অনুরাগ বেশী। তদুপরি কবিতার অবোধ্য, দূর্বোধ্য ভাষা ও শব্দ সংযোজনের প্রবণতা লক্ষ্যণীয় সিরাজগঞ্জের সাহিত্য সংস্কৃতির ধারা প্রবাহমান রাখতে চেষ্টা করছে শহর ও পল্লীর বিভিন্ন সাহিত্য-পত্র পত্রিকা, সাময়িকী এবং প্রবীণ ও তরুন কবি সাহিত্যিকগণ ও শিল্প সাহিত্য সংবাদ ও গোষ্ঠী। তন্মধ্যে যমুনা সাহিত্য গোষ্ঠী, উদিচী, বাস্কার শিল্পী চক্রের নাম উল্লেখযোগ্য।

সিরাজগঞ্জের বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদগণ হলেন :

যাদব চন্দ্র চক্রবর্তী (১৮৫৫-১৯২০)
সিরাজগঞ্জ জেলা শহর থেকে মাত্র সাত আট মাইল দক্ষিণে কামারখন্দ উপজেলার ঝাঐল ইউনিয়নের তেঁতুলিয়া গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম কৃষ্ণ চন্দ্র চক্রবর্তী ও মাতার নাম দূর্গা সুন্দরী। তিনি খুবই মেধাবী ছাত্র ছিলেন। তিনি গণিত শাস্ত্রে কৃতিত্বের সঙ্গে এম এ ডিগ্রী হাসিল করে প্রথমে কলকাতা সিটি কলেজে অধ্যাপনা শুরু করেন এবং এখান থেকেই পাটিগণিত রচনায় মশগুল হন। আলীগড় মুসলিম বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা স্যার সৈয়দ আহমদ যাদব চন্দ্রকে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে পাটিগণিতের অধ্যাপক পদে নিয়োগ দেন এবং নিজ বাসভবনের কাছেই যাদব চন্দ্রের জন্য একটি বাংলো বাড়ী ভাড়া করে দেন। যাদব পরে আলীগড় কলেজে অধ্যাপনা কালে ১৮৯০ সালে ইংরেজিতে তার পাটিগণিত বইটি প্রকাশ করেন। অল্পকালের মধ্যেই সেই পাটিগণিত বাংলা, উর্দু, হিন্দী, আসামী, মায়াবী, নেপালী প্রভৃতি ভাষায় অনুবাদের মাধ্যমে প্রচলিত হয়। ১৯১২ সালে যাদব চন্দ্র চক্রবর্তী বীজগণিত প্রকাশ করেন। সেই বীজগণিতও একই রকম জনপ্রিয়তা লাভ করে। তিনি ১৯১৬ সালে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে থেকে অবসর গ্রহণ করে সিরাজগঞ্জে দেশের বাড়ীতে ফিরে আসেন। ইতঃপূর্বে ১৯০১ সালে তিনি সিরাজগঞ্জ শহরের ধানবান্ধিতে একটি পাকা ইমারত তৈরী করে ছেলেমেয়েদেরকে এখানে রেখেই পড়াশোনার বন্দোবসত্ম করেছিলেন। অবসর জীবনে তিনি সেই বাড়ীতে এসেই বসবাস করতে থাকেন। তিনি গ্রামের বাড়ী তেঁতুলিয়ায় একটি পাকা মন্দির নির্মাণ করেছিলেন। ১৯২০ সালের ২৬ নভেম্বর ৬৯ বছর বয়সে কলকাতার নিজ বাসভবনে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

মোহাম্মদ নজিবর রহমান, সাহিত্যরত্ন (১৮৬০-১৯২৩)
তিনি ছিলেন একজন নামকরা ঐপন্যাসিক। তৎকালীন পাবনা জেলার শাহজাদুরের চরবেলতৈল গ্রামে তাঁর জন্ম। ঢাকার নর্মাল স্কুল থেকে পাস করে প্রথমে তিনি জলপাইগুড়ির একটি নীলকুঠিতে চাকরি করেন; পরে শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করে সিরাজগঞ্জের ভাঙ্গাবাড়ি মধ্য ইংরেজি বিদ্যালয়, সলঙ্গা মাইনর স্কুল ও রাজশাহী জুনিয়র মাদ্রাসায় চাকরি করেন। কিছুদিন তিনি ডাকঘরে পোষ্ট মাস্টারের দায়িত্বও পালন করেন। নজিবর রহমান ১৮৯২ সালে নিজ গ্রামে একটি মকতব স্থাপন করেন যা পরবর্তীকালে একটি বালিকা বিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়। তিনি যখন সলঙ্গায় শিক্ষকতা করতেন তখন সেখানকার হিন্দু জমিদার গোহত্যা ও গোমাংস ভক্ষণ নিষিদ্ধ করলে তিনি তার প্রতিবাদ করেন, এর ফলে সে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহৃত হয়। নজিবর রহমান র (১৮৮০-১৯৩১) প্রত্যক্ষ অনুপ্রেরণায় সাহিত্যকর্মে ব্রতী হন। তাঁর প্রথম সামাজিক আনোয়ারা (১৯১৪) লিখে তিনি বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। তাঁর অন্যান্য উপন্যাস হলো: প্রেমের সমাধি (১৯১৫), চাঁদতারা বা হাসান গঙ্গা বাহমণি (১৯১৭), পরিণাম (১৯১৮), গরীবের মেয়ে (১৯২৩), দুনিয়া আর চাইনা (১৯২৪) ও মেহেরুন্নিসা। বিলাতী বর্জন রহস্য (১৯০৪) ও সাহিত্য প্রসঙ্গ (১৯০৪) তাঁর অপর দুটি আলোচনা গ্রন্থ। নজিবর রহমান তাঁর উপন্যাসে গ্রামীণ মুসলিম পরিবারের অন্তরঙ্গ ছবি তুলে ধরতে সক্ষম হন। সাহিত্যে অবদানের জন্য তিনি ‘সাহিত্যরত্ন’ উপাধি লাভ করেন। ১৯২৩ সালের ১৮ অক্টোবর রায়গঞ্জের হাটিকুমরুল গ্রামে তাঁর মৃত্যু হয়।

সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী (১৮৮০-১৯৩১)
সিরাজগঞ্জের বিশিষ্ট লেখক, বাগ্মী এবং কৃষক নেতা। তিনি সিরাজগঞ্জ জেলায় জন্মগ্রহণ করেন (এ কারণেই তিনি তাঁর নামের সঙ্গে ‘সিরাজী’ উপাধি যুক্ত করেন)। পিতা আব্দুল করিম খন্দকার (১৮৫৬-১৯২৪) ইউনানী (ভেষজ ঔষধ) চিকিৎসক ছিলেন। আর্থিকভাবে তিনি তেমন স্বছল ছিলেন না। তাই যথেষ্ট মেধাবী হওয়া সত্ত্বেও সিরাজীর কলেজে পড়া সম্ভব হয়নি। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করতে না পারলেও তিনি মেধা চর্চা থেকে নিজেকে সরিয়ে নেননি। সিরাজী লেখালেখি করে এবং সভা সমিতিতে বক্তৃতা করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। তাঁর লেখা ও বক্তৃতার প্রধান বিষয়বস্ত ছিল বাংলার অনগ্রসর মুসলিম সমাজকে জাগিয়ে তোলা। বাগ্মী হিসেবে তিনি যথেষ্ট সুনাম অর্জন করেছিলেন। মুসলমানদের স্বার্থের কথা বললেও তিনি সাম্প্রদায়িক ছিলেন না। তিনি মনে করতেন, সম্পদের সুসম বন্টনের মধেই হিন্দু-মুসলমানের সৌহার্দ নির্ভর করছে। ইসমাইল হোসেন সিরাজী একই সাথে বেশ কিছু সংগঠন ও দলের সদস্য ছিলেন, যেমন অল ইন্ডিয়া ন্যাশনাল কংগ্রেস, জামিয়াত-ই-উলামা-ই-হিন্দ, ’স্বরাজ পার্টি ও কৃষক সমিতি। শিবলী নোমানী (১৮৫৭-১৯১৪) ও মুহম্মদ ইকবালের (১৮৭৬-১৯৩৮) প্রভাব প্রতিফলিত হয়েছিল সিরাজীর ওপর। তাঁদের মতো তিনিও অনুভব করেছিলেন যে ধর্মীয় ও সেক্যুলার চিন্তার মধ্যে সমন্বয় সাধন করে একদিকে যেমন ভারতীয় মুসলমান সম্প্রদায়কে জাগিয়ে তোলা সম্ভব, অন্যদিকে তেমনি সম্ভব অবনতিশীল হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কে উন্নয়ন। সমসাময়িক পত্রিকা আল-এসলাম, ইসলাম প্রচারক, প্রবাসী, প্রচারক, কোহিনুর, সোলতান, মোহাম্মাদী, সওগাত, নবযুগ ও নবনূর প্রভৃতিতে সিরাজীর লেখা প্রকাশিত হতো। তাঁর অধিকাংশ লেখাতেই ইসলামি ঐতিহ্য সংস্কৃতি ও উত্তরাধিকারকে উদ্দীপ্ত করে তোলার প্রয়াস ছিল। তিনি আধুনিক শিক্ষা ও সত্যিকার ইসলামি শিক্ষার পক্ষে বক্তব্য রেখেছিলেন। ইসমাইল হোসেন সিরাজী সিরাজগঞ্জে কৃষক আন্দোলনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। তিনি জমিদার ও মহাজন বিরোধী আন্দোলনে কৃষকদের সংগঠিত করেন। ইসমাইল হোসেন সিরাজীর কাব্যগ্রন্থগুলি হচ্ছে অনল প্রবাহ (১৯০০), আকাংখা (১৯০৬), উচ্ছ্বাস (১৯০৭), উদ্বোধন (১৯০৭), নব উদ্দীপনা (১৯০৭), স্পেন বিজয় কাব্য (১৯১৪), সঙ্গীত সঞ্জীবনী (১৯১৬), প্রেমাঞ্জলি (১৯১৬)। তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাস হচ্ছে রায়নন্দিনী (১৯১৫), তারাবাঈ (১৯১৬), ফিরোজা বেগম (১৯১৮) ও নুরুদ্দীন (১৯১৯) ইত্যাদি।

রজনীকান্ত সেন (১৮৬৫-১৯১০)
তিনি ছিলেন খ্যাতনামা কবি, গীতিকার ও সঙ্গীতশিল্পী । ১৮৬৫ সালের ২৬ জুলাই সিরাজগঞ্জ জৈলার ভাঙ্গাবাড়ি গ্রামে তাঁর জন্ম। পিতা গুরুপ্রসাদ সেন ছিলেন সেন ছিলেন একজন সঙ্গীতজ্ঞ ব্যক্তি। রজনীকান্ত কুচবিহার জেনকিস স্কুল থেকে এন্ট্রান্স (১৮৮৩), রাজশাহী কলেজ থেকে এফ, এ এবং কলকাতা সিটি কলেজ থেকে বি,এ ও বি,এল (১৮৯১) ডিগ্রী লাভ করেন। এরপরই তিনি রাজশাহী কোর্টে ওকালতি শুরু করেন। কিছুদিন তিনি নাটোর ও নওগাঁয় অস্থায়ী মুন্সেফও ছিলেন। রজনীকান্ত শৈশব থেকেই পিতার নিকট সঙ্গীত শেখেন এবং মাত্র পনেরো বছর বয়সে কালীসঙ্গীত রচনা করে কবিত্বশক্তির পরিচয় দেন। রাজশাহীতে অক্ষয়কুমার মৈত্রের বাড়িতে তিনি স্বরচিত গান পরিবেশন করতেন। সেখানকার উৎসাহ নামক মাসিক পত্রিকায় তাঁর রচনা প্রকাশিত হতো। তিনি কবিতাও রচনা করতেন এবং ‘কান্তকবি’ নামে খ্যাত ছিলেন। তাঁর কবিতা ও গানের বিষয়বস্ত্ত ছিল প্রধানত ভক্তি ও দেশপ্রেম। তাঁর রচিত গন্থগুলি হলো : বাণী (১৯০২), কল্যাণী (১৯০৫), অমৃত (১৯১০), অভয়া (১৯১০), আনন্দময়ী (১৯১০), বিশ্রাম (১৯১০), সম্ভাবকুসুম (১৯১৩), শেষদান (১৯১৬), পথচিন্তামণি এবং অভয় বিহার। এগুলোর মধ্যে বাণী ও কল্যাণী গানের সঞ্চয়ন, পথচিন্তামণি একটি কীর্তনগ্রন্থ, আর অভয় বিহার একটি গীতিকাব্য। ১৯১০ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর তার মৃত্যু হয়।

মোহাম্মদ বরকতুত্মল্লাহ (১৮৯৮-১৯৭৪)
লেখক, প্রবন্ধকার। ১৮৯৮ সালের ২ মার্চ তৎকালীণ পাবনা জেলার শাহজাদপুরের ঘোড়াশালে তাঁর জন্ম। তিনি শাহজাদপুর হাই স্কুল এবং রাজশাহী কলেজে অধ্যয়ন করেন। তারপর তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.এ (অনার্স, ১৯১৮) এবং প্রেসিডেন্সীকলেজ থেকে এম এ (দর্শন, ১৯২০) ও আইন পরীক্ষায় (১৯২২) পাস করেন। অতঃপর বেঙ্গল সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তিনি চাকরিজীবনে প্রবেশ করে একে একে আয়কর অফিসার (১৯২৩), ডেপুটি ম্যাজিষ্ট্রেট (১৯২৪), ম্যাজিস্ট্রেট (১৯৩০), সাব-ডিভিশনাল অফিসার (১৯৩৬) এবং কলকাতার রাইটার্স বিল্ডিং- এ সহকারী সেক্রেটারী (১৯৪৪) হন। সিভিল সাপ্লাই বিভাগেও তিনি কিছুদিন চাকরি করেন। পাকিস্তান হওয়ার পর তিনি ফরিদপুর, কুষ্টিয়া ও ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক (১৯৪৮-৫১) এবং পর্ব পাকিস্তান সরকারের ডেপুটি সেক্রেটারী (১৯৫১-৫৫) ছিলেন। অবসর গ্রহণের পর ১৯৫৫-৫৭ পর্যন্ত বাংলা একাডেমীতে তিনি বিশেষ কর্মকর্তা হিসেবে প্রথম পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। বরকতুল্লাহ সরকারি দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সাহিত্যচর্চাও করতেন। আধুনিক বাঙালি মুসলমান লেখকদের মধ্যে তিনিই সর্বপ্রথম দাশট্টনিক ভাবনাসমৃদ্ধ প্রবন্ধ রচনায় আত্ননিয়োগ করেন। তাঁর গ্রন্থসমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো : পারস্য প্রতিভা (২ খল্প ১৯২৪, ১৯৩২), মানুষের ধর্ম (১৯৩৪), কারবালা ও ইমামবংশের ইতিবৃত্ত (১৯৫৭), নয়া জাতির সৃষ্টা হযরত মুহম্মদ (১৯৬৩), বাংলা সাহিত্যে মুসলিম ধারা (১৯৬৯) ইত্যাদি। দর্শনের বিভিন্ন দুরূহ বিষয় সাবলীল বাংলা গদ্যে প্রকাশ করে তিনি প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। তিনি প্রবন্ধ সাহিত্যে বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৬০), নয়া জাতির স্রষ্টা হযরত মুহম্মদ গ্রন্থের জন্য দাউদ পুরস্কার (১৯৬৩) লাভ করেন এবং পাকিস্তান সরকার কর্তৃক সিতারা-ই-ইমতিয়াজ (১৯৬২) পদক ও প্রেসিডেন্ট এওয়ার্ড অফ পারফরমেন্স (১৯৭০) সম্মানে ভৃষিত হন। ১৯৭৪ সালের ২ নভেম্বর ঢাকায় তাঁর মৃত্যু হয়।

আবদুল্লাহ আল-মুতী শরফুদ্দিন (১৯৩০-১৯৯৮)
তিনি ছিলেন জনপ্রিয় বিজ্ঞান লেখক, শিক্ষাবিদ ও প্রশাসক। আবদুল্লাহ আল-মুতী শরফদ্দিন ১৯৩০ সালের ১ জানুয়ারি সিরাজগঞ্জ জেলার ফুলবাড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৫৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থ বিজ্ঞানে এম, এস সি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষা বিষয়ে ১৯৬০ সালে এম, এ ও ১৯৬২ সালে পিএইচ, ডি ডিগ্রী লাভ করেন। বাংলাদেশ সরকারের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের প্রাক্তন সচিব আল-মুতী শরফুদ্দিনের কর্মজীবন শুরু হয় সরকারি কলেজের একজন শিক্ষক হিসেবে। পরবর্তীতে তিনি শিক্ষক-প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের পরিচালক, জনশিক্ষা পরিচালক (ডিপিআই), বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাসের শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিষয়ক কাউন্সিলর, শিক্ষা ও বিজ্ঞান বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম-সচিব, অতিরিক্ত সচিব ও সচিবের দায়িত্ব পালন করেন। চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের পর তিনি এডিবি-ইউএনডিপি অর্থায়নকৃত মাধ্যমিক বিজ্ঞান শিক্ষা প্রকল্পের প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন।

গোলাম মকসুদ হিলালী (১৯০০-১৯৬১)
তিনি ছিলেন সিরাজগঞ্জের অন্যতম শিক্ষাবিদ, ভাষাবিদ ও সাহিত্যিক। ১৯০০ সালের ৩০ নভেম্বর সিরাজগঞ্জের ফুলবাড়িতে তাঁর জন্ম। তিনি কলকাতা বিশ্ব বিদ্যালয় থেকে এম, এ (ফারসি/১৯২৪ ও আরবি/ ১৯৩২), বি,এল (১৯২৭) ও ডি.ফিল (১৯৪৯) ডিগ্রি লাভ করেন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল ‘ইরান ও ইসলাম: তাদের পারস্পরিক প্রভাব। গোলাম মকসুদ টাঙ্গাইল জেলার করটিয়া কলেজে ফারসি ভাষার অধ্যাপক (১৯২৬) হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন; তারপর তিনি বিভিন্ন সময়ে কৃষ্ণনগর কলেজ, কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ ও রাজশাহী কলেজে অধ্যাপনা করেন। মাঝে দুই বছর (১৯২৮-১৯৩০) তিনি পাবনা জজ কোর্টে ওকালতি করেন। ১৯৪০-৪১ সালে তিনি চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্কুলসমূহের সহকারী পরিদর্শকের দায়িত্ব পালন করেন।

ফতেহ লোহানী
সিরাজগঞ্জ থানার কাওয়াকোলা গ্রামে আবু লোহানীর আদি বাসস্থান ছিল। কিন্তু যমুনার ভাঙ্গনে কাওয়াকোলা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলে উল্লাপাড়া থানার শোনতলা গ্রামে তারা বসতি স্থাপন করেন। আবু লোহানী -এর বড় ছেলে ফতেহ লোহানী একাধারে সাহিত্যিক, সাংবাদিক, চলচ্চিত্র প্রযোজক, পরিচালক, অভিনেতা, নাট্যাভিনেতা ও ঢাকা বেতার কেন্দ্রের নিয়মিত কথিকা লেখক ছিলেন। ফতেহ লোহানী কলকাতার নাট্যাঙ্গনে অভিনয় করেছেন এবং ‘কিরন কুমার’ ছদ্ম নাম নিয়ে চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছেন। সাবেক পূর্ব পাকিসত্মানে আব্দুল জববার খানের পাশাপাশি ফতেহ লোহানীও চলচ্চিত্রের গোড়াপত্তনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছেন। ফতেহ লোহানীর পরিচালিত ‘আসিয়া’ ছায়াছবিটি রাষ্ট্রীয় পুরষ্কারে ভূষিত হয়েছিল। ফতেহ লোহানীর কবিতা ছিল খুবই হৃদয়গ্রাহী। তাঁর সম্পাদিত ‘অগত্যা’ সাহিত্য মাসিকটি অল্প দিনের মধ্যে দেশব্যাপী পরিচিত হয়ে উঠে। মওলানা আকরম খাঁর মাসিক ‘মোহাম্মদী’, কবি আবদুল কাদিরের সরকারী মাসিক পত্রিকা ‘মাহে-নও’ ইত্যাদির পাশে ফতেহ লোহানীর মাসিক ‘অগত্যা’ সম্পূর্ণ আলাদা ইমেজ নিয়ে পাঠক মহলে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। তবে ফতেহ লোহানীর কোন বই প্রকাশিত হয়নি।

মকবুলা মঞ্জুর
সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ থানার মুগবেলাই গ্রামে ১৯৩৮ সনে মকবুলা মঞ্জুর জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একজন প্রখ্যাত উপন্যাসিক, ছোট গল্পকার ও নাট্যকার। তার রচিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে আর এক জীবন (উপন্যাস), নীলকণ্ঠী, পঞ্চকন্যা প্রভৃতি। রেডিও ও টিভির জন্য কথিকা ও নাটক রচনায় তিনি সবসময় নিয়োজিত ছিলেন। সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক ড. মোখলেছুর রহমান, পাক বাংলাদেশের ফোক-ফ্যান্টাসী চিত্র পরিচালক ইবনে মিজান (মন্টু) ও বাংলাদেশের সৎ চলচ্চিত্র আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃত লেখক, সাংবাদিক আজিজ মেছের (টুংকু) মকবুলা মঞ্জুরের সহোদর ভাই।

ফজলে লোহানী
১৯২৭ সালে উল্লাপাড়া থানার শোনতলা গ্রামে প্রখ্যাত আবু লোহানীর ঔরষে ফতেহ লোহানী, ফজলে লোহানী, কামাল লোহানী ও হুসনা বানু প্রমুখ প্রতিভাশালী ছেলেমেয়ে জন্মগ্রহণ করেন। বাংলাদেশের টিভি রিপোর্টার হিসাবে ফজলে লোহানী মতো প্রতিভার সাক্ষাৎ আর কখনো মিলবে কিনা সন্দেহ আছে। ‘‘যদি কিছু মনে না করেন’’ এই শিরোনামে প্রতি মাসে পাক্ষিক দুটি টিভি রিপোর্টিং দেখার জন্য লক্ষ লক্ষ টিভি দর্শক বিপুল আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করতো। ভয়েস অব আমেরিকা ও রয়টারের জগত বিখ্যাত টিভি রিপোর্টারদের সমকক্ষ ফজলে লোহানী অপূর্ব ভঙ্গিমায় টিভি পর্দায় হাজির হয়ে দর্শকবৃন্দের বিপুল করতালির মধ্যে কখনো হাসি আনন্দ, কখনো বেদনা ভারাক্রামত্ম টিভি রিপোর্টিং এর মাধ্যমে দর্শকদের মুগ্ধ করে রাখতেন। তার অপর একটি টিভি রিপোটিং বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মওলানা ভাসানী যখন মহীপুরে বিশাল প্রজা সম্মেলন করছিলেন, তখন ফজলে লোহানী গিয়েছিলেন সেই মহীপুরে, মওলানা ভাসানাীর সাক্ষাৎকারের উপর টিভি রিপোর্টিং করবার জন্য। পরে ফজলে লোহানীর সেই রিপোর্টটি ‘মহীপুরের প্রামত্মরে’ নামে পত্রিকায় প্রকাশিত হলে বিভিন্ন মহলে তা ব্যাপক আলোচনার বস্ত্ততে পরিণত হয়েছিল। তিনি ‘পেনশন’ নামে একটি ছায়াছবিরও প্রযোজনা করেন। মাত্র ৫৮ বছর বয়সে ১৯৮৫ সালে তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।
সুচিত্রা সেন
সিরাজগঞ্জ জেলার বেলকুচি থানার অমত্মর্গত সেন ভাঙ্গাবাড়ী গ্রামে সুচিত্রা সেনের জন্ম। তিনি ছিলেন কবি রজনীকান্ত সেনের নাতনী। পাবনা শহরে লেখাপড়া শিখে সুচিত্রা সেন কলকাতায় চলে যান এবং পরবর্তীকালে মনোমোহিনী চিত্র তারকা হিসাবে বিশ্বজোড়া খ্যাতি অর্জন করেন।

হৈমন্তী শুকলা
সিরাজগঞ্জ শহরের কাসারিয়া পট্টিতে (বর্তমান মুন্সী মেহেরউল্লাহ সড়কে) হরিহর শুকলার ঔরষে হৈমমত্মী শুকলা জন্মগ্রহণ করেন। হরিহর শুকলা ছিলেন ছিলেন বৃটিশ আমলের একজন নামকরা গায়ক ও গানের ওসত্মাদ। যোগ্য পিতার যোগ্য মেয়ে হৈমমত্মী শুকলা আকাশবানীর নামকরা কণ্ঠশিল্পী ছিলেন। তার বহু লং প্লে ডিস্ক রেকর্ড বাজারে বের হয়েছে। এই জনপ্রিয় কণ্ঠ শিল্পী হৈমমত্মী শুকলা বর্তমানে কলকাতার টালিগঞ্জে বসবাস করছেন।

(সিরাজগঞ্জের এই বিশেষ লেখাটি জেলা তথ্য বাতায়ন থেকে নেওয়া)

সাহিত্য ও সংস্কৃতি

সাহিত্য ও সংস্কৃতি চেতনার বহিঃপ্রকাশ। এই প্রকাশ নানাভাবে নানা খাতে প্রবাহিত হয়। সাহিত্য সংস্কৃতির ধারা একদিনে গড়ে উঠে না। যুগ-যুগান্তরের মিলন ও একাত্মতা একে সার্থক ও সমম্বিয়ত করে। বিভিন্ন জেলা ও মহকুমায় তা লক্ষ্য করা যায়। সাহিত্যের ক্ষেত্রে সিরাজগঞ্জের সম্পর্ক রংপুর, বগুড়া, পাবনা সদর, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, যশোর ও খুলনার সংগে। যাতায়াত ও ব্যবসা বাণিজ্য জনিত কারনেই এই যোগাযোগ চলছে বা চলে আসছে। অধুনা রাজশাহী ও নবাবগঞ্জের সাথে রেল সংযোগ থাকায় যোগাযোগ সম্ভব হচ্ছে। রংপুর, বগুড়া, পাবনা ও কুষ্টিয়ার লোক সাহিত্য, ফকিরী, মুর্শিদী, মারফতী গান-গজল, লোক কাহিনী প্রভৃতির মধ্যে একটা স্বতন্ত্র ভাব লক্ষ্য করা যায়। এই স্বতন্ত্রতা বরেন্দ্রভূমি রাজশাহী-নাটোরের প্রভাবমুক্ত। এই ভাবধারা পাশাপাশি চলে আসছে যুগ যুগ ধরে। রংপুর, বগুড়া, পাবনা, কুষ্টিয়া বলয়ের সাহিত্য সংস্কৃতি ভিন্ন গতিপ্রকৃতি বিশিষ্ট, ইসলামী চিমত্মা ধারার প্রতিফলন এতে বেশী স্পষ্টতর হয়। সাহিত্য, সংস্কৃতির এই প্রবাহ যদিও তর্কাতীত নয়, তবু দৃশ্যমান ও প্রকট স্বতন্ত্র ও বৈশিষ্ট্য স্বীকার্য সত্যরূপে প্রতীয়মান। সাদৃশ্য-বৈসাদৃশ্যের মধেই সম্বনয় সাধন প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে ও থাকা দরকার। সিরাজগঞ্জের নাটকের স্থান পূর্ব থেকেই উন্নত, এখনও এখানে নাটক, যাত্রা অভিনীত হয় বেশী। কলিকাতার বিখ্যাত নটরাজ ছবি বিশ্বাসের বাড়ী সিরাজগঞ্জ থানার বাগবাটি গ্রামে ছিল। প্রখ্যাত আইনজীবি অমিত বাবু ছিলেন নাটক প্রিয়। এখনও বহু নাট্যকার বর্তমান। পূর্বের নাট্যশালা এখন পৌর মিলনায়তনে পরিবর্তিত হয়েছে। এখানেও নাটক মঞ্চস্থ হয়। অন্যান্য স্থানের মত সিরাজগঞ্জের কবিতা চর্চা অনেক বেশী। যখনই কোন পর্ব আসে, তখন কবিতার ঢল নামে। এখন ছন্দের প্রতি অনুরাগ নাই। আধুনিক কবিতার প্রতি অনুরাগ বেশী। তদুপরি কবিতার অবোধ্য, দুর্বোধ্য ভাষা ও শব্দ সংযোজনের প্রবণতা লক্ষ্যণীয় সিরাজগঞ্জের সাহিত্য সংস্কৃতির ধারা প্রবাহমান রাখতে চেষ্টা করছে শহর ও পল্লীর বিভিন্ন সাহিত্য-পত্র পত্রিকা, সাময়িকী এবং প্রবীণ ও তরুন কবি সাহিত্যিকগণ ও শিল্প সাহিত্য সংবাদ ও গোষ্ঠী। তন্মধ্যে যমুনা সাহিত্য গোষ্ঠী, উদিচী, বাস্কার শিল্পী চক্রের নাম উল্লেখযোগ্য।

অর্থনৈতিক অবস্থা

সিরাজগঞ্জ জেলার অর্থনৈতিক অবস্থা যথেষ্ট সমৃদ্ধ এবং সম্ভাবনাময়। এখানকার জনসাধারণের আয়ের প্রধান উৎসসমূহ হচ্ছে কৃষি, তাঁতশিল্প, বস্ত্রশিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য, মৎস্য চাষ, দুগ্ধশিল্প, মৃৎশিল্প, কুটির শিল্প ইত্যাদি। জনসাধারণের প্রায় সকলেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির উপর নির্ভরশীল। এছাড়া তাঁত সমৃদ্ধ হওয়ায় জেলার প্রায় সকল উপজেলাতেই বিপুল পরিমাণে তাঁত বস্ত্র উৎপাদন হয়। এ সকল তাঁত শিল্পের সাথে জড়িত সূতা ও বস্ত্র কেনাবেচাকে কেন্দ্র করে এ জেলায় বিরাট অংকের আর্থিক লেনদেন সংঘটিত হয়। বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ দুগ্ধ ও দুগ্ধজাতপণ্য উৎপাদন কারখানা মিল্কভিটা এ জেলায় অবস্থিত। এ কারখানাকে কেন্দ্র করে বিপুল সংখ্যক গবাদি পশু পালন করা হয়। যার সাথে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক জনগোষ্ঠির জীবন জীবিকা জড়িত। এ জেলার শাহজাদপুর উপজেলায় বাঘাবাড়ি নৌ-বন্দর অবস্থিত। সেখানে ভাসমান বিদ্যুৎ কেন্দ্র, সিমেন্ট কারখানাসহ পেট্রোলিয়াম জাতীয় পদার্থের ডিপো অবস্থিত। এসকল স্থাপনায় ব্যাপক সংখ্যক শ্রমিক নিয়োজিত থেকে তাদের জীবন জীবিকা নির্বাহ করছে। যমুনা নদী ও চলনবিল অধ্যূষিত এ জেলায় বিপুল সংখ্যক বড় বড় আকারে দীঘি ও পুকুর বিদ্যমান। ফলে জনসংখ্যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ মৎস্য চাষ, আহরণ, ক্রয়-বিক্রয় এর মাধ্যমে তাদের জীবন জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। সব মিলিয়ে এ জেলার জনসাধারণের জীবন জীবিকা বৈচিত্র্যময় তবে জেলার ৫টি উপজেলা নদীর তীরবর্তী হওয়ায় এবং সে সকল উপজেলার ২০টির মত ইউনিয়ন নদীর চরাঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় নদীর তীরবর্তী ও চরাঞ্চলের এ সকল লোকজন প্রতি বছরই নদী ভাঙ্গন ও বন্যার সম্মুখীন হয়। ফলে নদী ভাঙ্গন, বন্যা, খরা ইত্যাদি প্রাকৃতিক দূর্যোগ এ জেলার জনসাধারনের নিত্যসঙ্গী। এ সকলের ভারে এ এলাকার জনসাধারণ জর্জরিত। ফলে জনসংখ্যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ দরিদ্র ও বেকার।

মুক্তিযুদ্ধ ও সিরাজগঞ্জ মহকুমা

মুক্তি সংগ্রাম আমাদের জাতীয় জীবনে এক অবিষ্মরণীয় অধ্যায়। সিরাজগঞ্জের আপামর জনসাধারণ স্বাধীনতার শক্তিতে উজ্জীবিত হয়ে এই সংগ্রামে সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের প্রথম ভাগেই স্কুল, কলেজ, অফিস, আদালত, যানবাহন, রেলস্টীমার, মিল কারখানা সব বন্ধ রাখতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান ঘোষণা দেন ও আওয়ামীলীগ কর্মীবৃন্দ সংগ্রাম পরিষদ গঠন করেন। আওয়ামী সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি ছিলেন মরহুম মোতাহার হোসেন তালুকদার এমএলএ এবং সদস্য সচিব ছিলেন জনাব আনোয়ার হোসেন রতু। একই সাথে জেলা ছাত্রলীগের নেতৃত্বে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়, যার আহবায়ক ছিলেন আলমগীর। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে ৩ মার্চ, ১৯৭১ জেলার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে তৎকালীন ছাত্র নেতা জনাব এম.এ রউফ পাতা প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন।

৮ মার্চ, ১৯৭১ তারিখ হতে আওয়ামী সংগ্রাম পরিষদ এবং ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে পাক হানাদারদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে কলেজ মাঠ ও স্টেডিয়াম মাঠে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রাথমিক অস্ত্র প্রশিক্ষণ শুরু হয়। কলেজ মাঠে প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন আনসার কমান্ডার আব্দুর রহমান, ল্যান্স নায়েক লুৎফর রহমান অরুন এবং রবিউল ইসলাম (গেরিলা)। স্টেডিয়াম মাঠে প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন সহকারী আনসার কমান্ডার বাহাজ আলী, সেনা সদস্য আমজাদ হোসেন ও রাইফেল ক্লাবের সদস্য জহুরুল ইসলাম মিণ্টু ।

পাক বাহিনী যাতে সিরাজগঞ্জে প্রবেশ করতে না পারে সে জন্য শাহজাদপুর উপজেলাধীন বাঘাবাড়ী ফেরীঘাটে স্থানীয় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধারা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তৎকালীন মহকুমা প্রশাসক শহীদ শামসুদ্দিন উক্ত প্রতিরোধ যুদ্ধে সার্বিকভাবে অংশ গ্রহণ করেন। এমনকি তিনি অস্ত্রাগার হতে সকল অস্ত্র মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে তুলে দেন। প্রবল প্রতিরোধের কারণে এক মাস পর ২৬ এপ্রিল সিরাজগঞ্জ শহরে পাক হানাদার বাহিনী প্রবেশ করে। পাক বাহিনী প্রবেশ করেই নির্বিচারে শহরের ঘর-বাড়ী জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেয়, লুটতরাজ করে, নিরীহ জনগনকে হত্যা, ধর্ষণ এবং নির্যাতন করতে থাকে।

পাক সেনারা সিরাজগঞ্জ দখল করার পর মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও মুক্তিযোদ্ধারা উচচতর প্রশিক্ষণ গ্রহণ এবং আধুনিক অস্ত্রের জন্য বিচ্ছিন্নভাবে ভারতে গমন করেন। ভারতে প্রশিক্ষণ গ্রহণ শেষে মুক্তিযোদ্ধাগণ সিরাজগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েন এবং পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে গেরিলা ও সম্মুখ যুদ্ধে লিপ্ত হন। উল্লেখযোগ্য যুদ্ধের মধ্যে রয়েছে যুব শিবিরের নেতৃত্বে ভদ্রঘাট, ব্রক্ষ্মগাছা ও নওগাঁর যুদ্ধ। এ যুদ্ধ উত্তরবঙ্গের বৃহত্তম যুদ্ধ ছিল। ৭ নং সেক্টরের এফ উইং এর নেতৃত্বে কাজিপুর থানা দখলের জন্য মুক্তিযোদ্ধারা দুবার থানা আক্রমণ করেন এবং বড়ইতলীতে পাক সেনাদের সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের ভয়াবহ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এ সকল যুদ্ধে বেশ কিছু পাকসেনা হতাহত হয় এবং সাত জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন।

৭ নং সেক্টরের এফ উইং এর নেতৃত্বে বেলকুচি থানা দখলের জন্য আরও একটি ভয়াবহ যুদ্ধ সংঘটিত হয় এবং মুক্তিযোদ্ধারা থানার দখল গ্রহণ করে থানার সকল অস্ত্র হেফাজতে নেন এবং ১২ জন রাজাকারকে গ্রেফতার করেন। এতে দুইজন মুক্তিযোদ্ধা আহত হন। বেলকুচির রাজাপুর, শমেসপুর ও কালিয়াহরিপুর ব্রীজে এফএফদের নেতৃত্বে পাক সেনাদের সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। পলাশডাঙ্গা যুব শিবির, এফএফ ও বিএলএফ এর মুক্তিযোদ্ধাগণ একে একে তাড়াশ, রায়গঞ্জ, উল্লাপাড়া ও শাহ্জাদপুরসহ জেলার বিভিন্ন স্থানে পাক বাহিনীর সাথে যুদ্ধ করে ঐ সকল এলাকা দখল করে নেয়। সবশেষে ১২ ডিসেম্বর ১৯৭১ সিরাজগঞ্জে মুক্তিযোদ্ধাগণের অধিকাংশ দল একত্রে সিরাজগঞ্জ শহরের উত্তরে শৈলাবাড়ি পাক হানাদার ক্যাম্প আক্রমণ করেন। এখানে সিরাজগঞ্জ এর সবচেয়ে ভয়াবহ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এ যুদ্ধে পাক বাহিনী পরাজিত হয়ে পশ্চাদপসরণ করে এবং তারা ব্যাপকভাবে হতাহত হয়। তাছাড়া ইঞ্জিনিয়ার আহসানুল হাবিব ও সোহরাব আলীসহ ছয় জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। অবশেষে মিত্র বাহিনীর কোনরূপ সহায়তা ছাড়াই ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ সিরাজগঞ্জ এর বীর মুক্তিযোদ্ধাগণ সিরাজগঞ্জ শহরকে এবং ১৫ ডিসেম্বর ১৯৭১ সমগ্র সিরাজগঞ্জকে শত্রুমুক্ত করেন। সিরাজগঞ্জ জেলার বিভিন্নস্থানে পাক বাহিনীর সাথে সম্মুখ ও গেরিলা যুদ্ধে যে সকল মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও মুক্তিযোদ্ধা নেতৃত্ব প্রদান করেছিলেন তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো মরহুম মোতাহার হোসেন তালুকদার এমএলএ, মরহুম আব্দুল মোমিন তালুকদার এমএলএ, সৈয়দ হায়দার আলী এমপিএ, মরহুম রওশনুল হক এমপিএ, আনোয়ার হোসেন রতু, মরহুম শহিদুল ‎ইসলাম তালুকদার, মরহুম আমির হোসেন ভুলু, মরহুম আব্দুল লতিফ মির্জা, আমিনুল ইসলাম চৌধুরী, আব্দুস সামাদ, ইসমাইল হোসেন, জহুরুল ইসলাম তালুকদার, গোলাম হায়দার খোকা, আবু মোহাম্মদ গোলাম কিবরিয়া, মোজাফ্ফর আহমেদ, ইসাহাক আলী, এম এ রউফ পাতা, বিমল কুমার দাস, শেখ আলাউদ্দিন, সোহরাব আলী, আমজাদ হোসেন মিলন, লুৎফর রহমান অরুণ, খ ম আকতার হোসেন, ফজলুল মতিন মুক্তা, টি এম শামীম পান্না, মরহুম শাহ্জাহান আলী তারা, মরহুম ইসমাইল হোসেন, শফিকুল ইসলাম শফি প্রমুখ। 

(সিরাজগঞ্জের এই বিশেষ লেখাটি জেলা তথ্য বাতায়ন থেকে নেওয়া)

সিরাজগঞ্জ এর নামকরণ

বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিম প্র্রান্তে অবস্থিত সিরাজগঞ্জ জেলা উত্তরবঙ্গের প্রবেশ দ্বার হিসেবে সুপরিচিত। যমুনা নদী বিধৌত এ জেলার ভৌগলিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গন বৈচিত্রময়। এ জেলাটি দুর্যোগপ্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিত। জেলার ৯টি উপজেলার মধ্যে ৫টি উপজেলাই যমুনা নদীর তীরে অবস্থিত। ফলে নদী ভাঙ্গন এ জেলার জনসাধারণের নিত্য সঙ্গী। এছাড়া বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে চলনবিলের অবস্থান। ভৌগলিক কারণেই বন্যা, খরা, নদী ভাঙ্গনসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে এ জেলার জনসাধারণ জর্জরিত। সব মিলিয়ে দারিদ্র, বেকারত্ব এবং বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ এ জেলার আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের পথে অন্তরায়।

বেলকুচি থানায় সিরাজউদ্দিন চৌধুরী নামক এক ভূস্বামী (জমিদার) ছিলেন। তিনি তাঁর নিজ মহালে একটি ‘গঞ্জ’ স্থাপন করেন। তাঁর নামানুসারে এর নামকরণ করা হয় সিরাজগঞ্জ। কিন্তু এটা ততটা প্রসিদ্ধি লাভ করেনি। যমুনা নদীর ভাঙ্গনের ফলে ক্রমে তা নদীগর্ভে বিলীন হয় এবং ক্রমশঃ উত্তর দিকে সরে আসে। সে সময় সিরাজউদ্দীন চৌধুরী ১৮০৯ সালের দিকে খয়রাতি মহল রূপে জমিদারী সেরেস্তায় লিখিত ভুতের দিয়ার মৌজা নিলামে খরিদ করেন। তিনি এই স্থানটিকে ব্যবসা বাণিজ্যের প্রধান স্থানরূপে বিশেষ সহায়ক মনে করেন। এমন সময় তাঁর নামে নামকরণকৃত সিরাজগঞ্জ স্থানটি পুনঃ নদীভাঙ্গণে বিলীণ হয়। তিনি ভুতের দিয়ার মৌজাকেই নতুনভাবে ‘সিরাজগঞ্জ’ নামে নামকরণ করেন। ফলে ভুতের দিয়ার মৌজাই ‘সিরাজগঞ্জ’ নামে স্থায়ী রূপ লাভ করে। কথিত আছে মরহুম সিরাজউদ্দিন চৌধুরী কেবল একজন ধনী লোকই ছিলেন না তিনি প্রজাবৎসল, অতীব ধর্মপরায়ন এবং পীরভক্ত লোক ছিলেন। অনেকে মনে করেন সিরাজগঞ্জের দরগা রোডের মাজার শরীফ উক্ত চৌধুরী পীর সাহেবের। কেউ কেউ মনে করেন উক্ত মাজার শরীফে অবস্থানরত রুহ মোবারক, দেহাবশেষ চৌধুরী সাহেবের নিজের যা বেলকুচি হতে পরবর্তী সময়ে আনীত ও সমাহিত। সকল সম্প্রদায় ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকলেই উক্ত দরগা ও মাজার শরীফকে সম্মান করে থাকেন। অদূরেই হিন্দুদের ‘মহাপ্রভুর আখড়া’ অবস্থিত। তার অনতি দূরেই পশ্চিম-দক্ষিণ দিকে বাণীকুঞ্জে সুসাহিত্যিক ও সুকবি মরহুম সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজীর মাজার শরীফ অবস্থিত।

(সিরাজগঞ্জের এই বিশেষ লেখাটি জেলা তথ্য বাতায়ন থেকে নেওয়া)

সিরাজগঞ্জ জেলার ইতিহাস

প্রাচীন কাল
সপ্তম শতাব্দীর পর থেকেই ময়মনসিংহের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চল অর্থাৎ সিরাজগঞ্জ, জামালপুর, টাঙ্গাইল, গাজীপুর, ফরিদপুর বছরের প্রায় আট/নয় মাস পানির নিচে থাকতো। ফলে জনবসতি ছিল কম। এ অঞ্চল থেকে পানি সাগরের দিকে নেমে গেলে বছরের চার পাঁচ মাস সময়ে পাশ্ববর্তী কায়েম অঞ্চল থেকে লোকজন আবাদ বসত চালু রাখার জন্য ভীড় জমাতো। সেই শুকনো মৌসুমে কতিপয় মেহনতি মানুষ একতাবদ্ধ হয়ে পরবর্তী বছরে প্লাবনের হাত থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য জাংগাল (বাঁধ) তৈরী করত। ফলে জাংগালের মধ্যকার জলাভূমি কিছুকালের মধ্যেই কায়েমী অঞ্চলের আকার ধারণ করত। ধারণা করা হয় সমূদ্রতট থেকে সমতট শব্দটির উৎপত্তি। চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন সাং এর সঙ্গে প্রায়ই ঐক্যমতে ডাঃ কালিদাস নাগ, পিএইচডি তদানিন্তন বঙ্গের পূর্বের নিম্নাঞ্চলকে অর্থাৎ পূর্ব বঙ্গের প্রায় অংশকেই সমতট বলে আখ্যা দিয়েছেন। ময়মনসিংহের অধিকাংশ এলাকাই এই সমতটের অন্তর্গত সমতল ভূমি। শশাঙ্ক ৬১৯ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত বঙ্গদেশে রাজত্ব করেন, জ্ঞান সমগ্র আর্য্যবর্তে বাঙ্গালীদের সম্রাজ্য স্থাপনের স্বপ্ন দেখেন এবং আংশিক সে স্বপ্নকে সফল করেন (R.C. Mojuccedu Bangladesher Itihash-P-31)। পরবর্তী যুগে বাঙ্গালী বংশোদ্ভুত শেরশাহের পুত্র সলিম শাহ শের শাহের মৃত্যুর পর জালাল উদ্দিন খাঁ সলিম শাহ নাম ধারণ পূর্বক দিল্লীর মসনদে আরোহন করেন। তিনিই একমাত্র বাঙালী যিনি দিল্লির মসনদে শেরশাহের পুত্র রূপে আরোহণ করে আট বৎসর রাজত্ব করেন (১৫৪৫-১৫৫৩ খৃঃ)। তিনি পাবনা জেলার চাইমোহর থানার অন্তর্গত সমাজ নামক গ্রামে জন্মলাভ করেন ও প্রতিপালিত হন এবং পরে দিল্লী গমন করে পিতার সহিত মিলিত হন ও শাহী মসনদে আরোহন করেন। পাল রাজাগণের সময় এ অঞ্চলের শাসকদের লাট, চাট, ভাট ইত্যাদি পদ দেয়া হত। সম্ভবত এই ভাট হইতেই বঙ্গদেশের যমুনা নদীর ও রাজমহলের নিম্নেদেশ – পাবনা ও ফরিদপুর অঞ্চল ভাটের দেশ বলে পরিচিত। পাবনা জেলা ও তৎকালে সিরাজগঞ্জ মহকুমায় যে বিরাট চলনবিলের অস্তিত্ব বর্তমান তা দৃষ্টে ও পাবনা জেলার ইতিহাস (রাধা রমন সাহা-১-৩ খন্ড), অধ্যাপক আব্দুল হামিদ এর চলনবিলের ইতিকথা ও প্রমথবিশীর চলনবিল গ্রন্থে যে ঐতিহাসিক বর্ণনা বিভিন্ন ভাবে পাওয়া যায়, তৎসঙ্গে হজরত শাহ জালাল (রঃ) জীবনী গ্রন্থ (কৃত চৌধুরী গোলাম আকবর) এর খন্দকার আব্দুর রহিম সাহেবের টাঙ্গাইলের ইতিহাস এবং করটিয়া খান পন্নী সাহেবের নিজস্ব ইতিহাস পাঠে জানা যায় যে রাজমহল পাহাড় হতে টাঙ্গাইলের দক্ষিণে আটিয়া গ্রামের পশ্চিম পাশের লৌহজং নদী পর্যন্ত বিশাল জলধিতল ছিল (আটিয়া শাহী মসজিদ লৌহজং নদীর পূর্বতীরে প্রতিষ্ঠাকাল ১৬০৯)। সম্রাট আকবরের রাজত্ব কালে কাগমারীর দরবেশ হযরত শাহ জালাল (রঃ) এবং তার মামা শাহানশাহ হযরত বাবা আদম (রঃ) কাশ্মিরী এ অঞ্চলে আগমন ও ইসলাম প্রচার করেন। তাঁদের জীবনীতেই বিশাল জলধির মধ্যে চর জাতীয় প্রাচীন ভূমির উল্লেখ পাওয়া যায়। অনুরূপভাবে শাহজাদপুরে হযরত শাহদৌলা মখদুম (রঃ) সিরাজগঞ্জে হযরত শাহ সিরাজউদ্দিন, নওগাঁতে দাদাপীর, রাজশাহী জেলার বাঘাতে শাহাদৌলা জামী দানেশমন্দ (রঃ) এবং চর মধ্যাহ্ন দ্বীপে বারুহাস ইমামবাড়ী পীর সাহেবের আগমন ঘটে।

মধ্য যুগ
১১৯৩ খৃষ্টাব্দে কুতুব উদ্দিন আইবেক দিল্লী জয় করেন। কুতুব উদ্দিন তার অনুচর ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজিকে বাংলা ও বিহার জয় করার জন্য প্রেরণ করেন। ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি ১২০৪ খৃষ্টাব্দে বাংলা জয় করেন ও এ অঞ্চল মুসলিম শাসকদের অধীনে আসে। এদেশে মুসলিম বিজয়ের ১৪০ বছর পর ইবনে বতুতার সফর নামা এবং ২০০ বছর পর মাহুয়ানের বিবরণ এই দুটো মিলিয়ে দেখলে আমরা খুব সহজেই এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে, মুসলিম বিজয়ের ১৫০ বছরের মধ্যেই সিরাজগঞ্জের অধিবাসীদের জীবনে ইসলাম একটা অপ্রতিরোধ্য ফ্যাক্টর হয়ে ওঠে এবং ২০০ বছরের মধ্যে অর্থাৎ যখন চৈনিক দূত মাহুয়ান এদেশে সফর করেন, তখন সিরাজগঞ্জের জনসাধারণের অধিকাংশ ইসলাম ধর্মের অনুসারী ছিল। মাহুয়ানের সফরের সময় সিরাজগঞ্জ তথা ভাটি অঞ্চলের জনসাধারণ তখন কেবল মুসলমান হিসেবে সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল তাই নয়, বরং স্বাধীন গোষ্ঠি হিসেবে সারা বিশ্বে বিখ্যাত হয়ে উঠেছিল। এ অঞ্চলের জনসাধারণ তখন মিথ্যা ও ছলচাতুরীর আশ্রয় নিতে জানত না। এভাবেই তারা ১৫৩৮ সাল পর্যন্ত স্বাধীনভাবেই বসবাস করছিল। ১৫৩৮ সালে মোঘল বাদশা হুমায়ূন গৌড় দখল করেন (সেপ্টেম্বর ১৫৩৮ খৃষ্টাব্দ)। গৌড়ের সুরম্য প্রাসাদাবলী ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখে বাদশা হুমায়ূন খুবই মুগ্ধ হন এবং তিনি এর নাম রাখেন জান্নাতাবাদ।

মুঘল আমল
মুঘল আমলে (১৫৩৮-১৭৪০ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত) সুবা বাংলাকে প্রশাসনিক সুবিধার্থে ১৯টি সরকারে এবং ৬৮২টি পরগণায় বিভক্ত করা হয়েছিল। সেই সরকার গুলির মধ্যে ‘সরকার বাজুহা’ আকার আয়তনে ছিল অনেক বড়। তৎকালে সরকার বাজুহাকে প্রশাসনিক সুবিধার্থে ৩২ টি মহলে বিভক্ত করে। সে সময় সরকার বাজুহা মোট রাজস্ব ছিল ৩৫,১৬,৮৭১ দাম যা টাকার হিসেবে ৯,৮৭,৯২১ টাকা (১ টাকা = ৪০ দাম)। সিরাজগঞ্জ জেলাটি সেই সরকার বাজুহার অন্তর্গত হলেও ৩২টি মহলের কোনটির মধ্যে অবস্থিত সেটা ধারণা করা কঠিন। ‘‘সরকার বাজুহার’’ মধ্যে আমাদের অতি পরিচিত মোমেনশাহী, ভাওয়াল বাজু ও ঢাকা বাজু উল্লেখ আছে। কিন্তু সিরাজগঞ্জ নামে আমরা কোন মহলের নাম দেখি না। সিরাজগঞ্জ যে সরকার বাজুহার মধ্যকার একটি এলাকা এ সম্বন্ধে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। ঢাকার কিছু এলাকা এবং ভাওয়ালগড় সহ বৃহত্তর মোমেনশাহী জেলার সমগ্র এলাকাই ছিল সরকার বাজুহার অন্তর্গত। ইতিহাস পর্যালোচনায় জানা যায়, ১৮৪৫ সনের পূর্ব পর্যন্ত সিরাজগঞ্জ ছিল মোমেনশাহী জেলার অন্তর্গত। ঈশা খানের আমলে সাগরের মতো যমুনা নদীর অথৈ পানি ছুটে চলতো এপার থেকে ওপার দশ বার মাইল জুড়ে। সিরাজগঞ্জ শহরটি যেখানে এখন অবস্থিত, সেখানটিতে জনমানুষের বসতি ছিল না সে আমলে। যমুনা নদীর মাঝি মাল্লারা সেখানে কখনো নৌকা ভিড়াতো না। সে এলাকাটি তখন লোকে বলতো ভুতের দিয়ার। এ নিয়ে রয়েছে বহু জনশ্রুতি। রাত্রি হলেই নাকি হাজারে হাজারে লাখে লাখে ভুত সেই দিয়ারে হাজির হত। যদি কোন নৌকা বিপাকে পড়ে সেই ভুতের দিয়ারের ধার কাছ দিয়ে রাত্রিকালে উজান ভাটি চলতো, তাহলে দেখা যেত নৌকার মাঝি মাল্লা চরনদারদের ঘাড় মটকিয়ে রেখেছে ভুতেরা। তবে এখনো সিরাজগঞ্জ আদি শহরটি যে মৌজাতে অবস্থিত, তার নাম বহাল তবিয়তে ভুতের দিয়ার রূপেই টিকে আছে। বর্তমান জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সংলগ্ন এলাকা এবং সদর ভূমি অফিস, পৌরসভা কার্যালয় ভুতের দিয়ার মৌজায় অবস্থিত।

বৃটিশ আমল
বৃটিশ আমলের গোড়ার দিকে বাংলাদেশের ৬৮২টি পরগনাকে জেলা হিসাবে গণ্য করা হয়নি। প্রথমে মুসলিম আমলের প্রশাসনিক কাঠামোকে পরিবর্তন করা হয়েছে। তারপর বাংলাদেশের প্রশাসনিক তাগিদ পূরণের উদ্দেশ্যে সারা দেশের মধ্যে মাত্র ৪/৫জন জেলা কালেক্টর নিয়োগ করা হয়েছে। বৃটিশ আমলের প্রথম দিকে নোয়াখালী, রংপুর, ঢাকা, ও মোমেনশাহী এই চারটি জেলা কালেক্টরেটের সাহায্যে বাংলাদেশের মতো একটি বিশাল দেশ শাসন করা হতো। ১৭৮৬ থেকে ১৭৯৩ সাল পর্যন্ত লর্ড কর্ণওয়ালিসের আমলে সিরাজ আলী চৌধুরী নামে এক সম্ম্ভ্রান্ত জমিদার ছিলেন সোহাগপুরে। ১৭৮৭ সালে মোমেনশাহী জেলা স্থাপিত হয়। এই একই বছরে লর্ড কর্ণওয়ালিসের কাছ থেকে বড় বাজু পরগনার সাত আনা হিস্যা সিরাজ আলী চৌধুরী ‘সিরাজগঞ্জ জমিদারী’ নামে পত্তনী লাভ করেন। কিন্তু বৃটিশ আমলের প্রথম দিকে জমিদারের হাতে যেহেতু প্রশাসনিক ক্ষমতা ন্যস্ত করা হয়নি, সেহেতু সিরাজগঞ্জ ছিল মোমেনশাহী জেলার প্রশাসনিক আওতায়; তখন জামালপুর, কিশোরগঞ্জ প্রভৃতিও মোমেনশাহী জেলার আওতাধীন ছিল। ১৭৯০ সালে মোমেনশাহী জেলার কালেক্টর সাহেব বিশাল মোমেনশাহী জেলার স্থানে স্থানে থানা স্থাপনের তাগিদে ঢাকা রেভিনিউ বোর্ডের কাছে পরানগঞ্জ, কটিয়াদী, চাঁদগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ, জগনাথগঞ্জ, শের মদন, শের দিবার দিয়া, শের মাচরা প্রভৃতি স্থানের প্রস্তাব পেশ করেন। ১৭৯২ সালের মধ্যে সিরাজগঞ্জসহ ঐসব এলাকায় প্রথম বিলেতি প্যাটার্নের থানা স্থাপিত হয়। ১৮৪৫ সালে মোমেনশাহী জেলায় ধরমচান্দ ঘোষ প্রথম ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট নিযুক্ত হয়ে আসেন। ম্যাজিস্ট্রেট মোমেনশাহী জেলার পূর্ব ও পশ্চিম দিকে দুইটি মহকুমা স্থাপনের প্রস্তাব করেন। শেরপুর, সিরাজগঞ্জ, হাজীপুর ও পিংনাসহ ৪ থানা নিয়ে ১৮৪৫ সালে জামালপুর মহকুমা এবং নিকলী, বাজিতপুর, ফতেপুর ও মাদারগঞ্জ এই ৪ থানা নিয়ে হুসেনপুর বা নিকলী মহকুমা স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়। ১৮৪৫ সালের এপ্রিল মাসে সরকার সিরাজগঞ্জ ও জামালপুর মহকুমা দুইটি স্থাপনের অনুমতি দেন। ফলে ১৮৪৫ সালে বিশাল মোমেনশাহী জেলার অধীনে জামালপুর ও সিরাজগঞ্জ নামে দুইটি মহকুমার সৃষ্টি করা হয়। প্রসঙ্গতঃ বলে রাখা যায়, পরবর্তীকালে মোমেনশাহী জেলাকে বিভক্ত করে ১৮৬৫ সালে কিশোরগঞ্জ, ১৮৬৯ সালে টাংগাইল এবং ১৮৮২ সনে নেত্রকোণা মহকুমা সৃষ্টি করা হয়েছিল। ইতিমধ্যে ১৮২৮ সালে রাজশাহীর একাংশ নিয়ে পাবনা জেলার পত্তন হয়েছিল। সিরাজগঞ্জবাসীর দীর্ঘদিনের দাবীর প্রেক্ষিতে ১৮৫৫ সালে যমুনা নদীর গতি পরিবর্তনের কারণে সিরাজগঞ্জ থানাকে পাবনা জেলার অন্তর্ভুক্ত করা হয় (পাবনা গেজেট পৃষ্ঠা নং ৪৩)। ১৮৭৫ সালে রায়গঞ্জ থানাকে সিরাজগঞ্জ মহকুমার অন্তর্ভুক্ত করে সিরাজগঞ্জের প্রশাসনিক বিস্তৃতি ঘটানো হয়েছিল। ১৯৮৪ সালে সিরাজগঞ্জ জেলা হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

সিরাজগঞ্জের পর্যটন ও ঐতিহ্য

পর্যটন
সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলায় যমুনা সেতু, হার্ডপয়েন্ট, রাণীগ্রাম গ্রোয়েন, কাঁটাখাল, ইলিয়ট ব্রীজ, যমুনা সেতুর (বাংলাদেশের বৃহত্তম সড়ক ও রেলসেতু) পাশাপাশি সয়দাবাদ ইউনিয়নে যমুনা ব্রীজ সংলগ্ন একটি ‘ইকোপার্ক’ প্রতিষ্ঠা করা হলেও জনগণের চাহিদানুযায়ী এখনও গড়ে উঠেনি। পরিপূর্ণভাবে গড়ে উঠলে দেশী-বিদেশী পর্যটকদের ব্যাপক সমাগম ঘটবে মর্মে আশা করা যায়। এছাড়া পৌর এলাকার হার্ডপয়েন্টে একটি পার্ক তৈরী করা হয়েছে। আবাসনের জন্য ইতোমধ্যেই শহর এলাকায় গড়ে উঠেছে দু’তিনটি উন্নতমানের আবাসিক হোটেল। উল্লাপাড়ার ঘাটিনা ব্রীজ সংলগ্ন এলাকায় প্রতিদিন বিকেলে আনন্দ ভ্রমনের জন্য লোকজন জড়ো হয়। এছাড়া বর্ষাকালে চলনবিল বেষ্টিত মোহনপুর, উধুনিয়া, বড়পাঙ্গাসী ও বাঙ্গালা ইউনিয়নের বিস্তির্ণ অঞ্চল নয়নাভিরাম শোভা ধারণ করে। সুফি সাধক শাহ কামাল (রহঃ) ধর্ম প্রচারের জন্য কামারখন্দে আসেন এবং তিনি ভদ্রঘাট ইউনিয়নের নান্দিনা কামালিয়া গ্রামে মৃত্যু বরণ করেন। তাঁর কবরকে ঘিরে তৈরী হয়েছে মাজার শরীফ। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ এ মাজার দর্শনে আসেন। সিরাজগঞ্জের উল্লেখযোগ্য পর্যটন স্থানগুলো হলোঃ

হার্ডপয়েন্ট-
সিরাজগঞ্জ জেলা যমুনা নদীর তীরে অবস্থিত। প্রতি বছর যমুনার অব্যহত ভাঙ্গনের ফলে শহরটি ধীরে ধীরে পশ্চিম দিকে স্থানান্তরিত হয়। প্রতি বছরের ভাঙ্গনের ফলে সরকার ১৯৯৬ সালে ৪৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৩ কিলোমিটার শহর রক্ষা বাধ নির্মাণ করেন। ফলে বর্তমানে শহর যমুনা নদীর ভাঙ্গনের হাত থেকে অনেকটা নিরাপদ হয়েছে। সেই সাথে অভাবিত ভাবে এই হার্ডপয়েন্টটি একটি পর্যটনের স্থান হিসেবে যথেষ্ট ভূমিকা রাখছে। প্রতি দিন দূর-দূরান্ত থেকে বহু ভ্রমণ পিপাসু মানুষ এই স্থানটি ভ্রমণ করে থাকেন। বর্ষা মৌসুমে এই স্থানটি খুবই আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। এখানে দাঁড়ালে যমুনা নদীর পূর্ণরূপ পর্যবেক্ষণ করা যায়। তাছাড়া এখান থেকে যমুনা বহুমূখী সেতুর নান্দনিক দৃশ্য উপভোগ করা যায়।

বঙ্গবন্ধু যমুনা বহুমূখী সেতুঃ
বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার দীর্ঘতম এবং বিশ্বের ১১তম দীর্ঘ সেতু এটি। ১৯৯৮ সালের জুন মাসে এটি উদ্বোধন করা হয়। বাংলাদেশের ৩টি বড় নদীর মধ্যে সবচেয়ে বৃহত্তম এবং পানি নির্গমনের দিক থেকে বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম নদী যমুনার উপর এটি নির্মিত হয়েছে। বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান এর নামানুসারে সেতুটির নামকরণ করা হয়। বঙ্গবন্ধু সেতু বাংলাদেশের পুর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে দুই অংশকে একত্রিত করেছে। এই সেতু নির্মাণের ফলে জনগণ বহুভাবে লাভবান হচ্ছে এবং এটি আন্তঃআঞ্চলিক ব্যবসায় ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। সড়ক ও রেলপথে দ্রুত যাত্রী ও মালামাল পরিবহন ছাড়াও এই সেতু বিদ্যুৎ ও প্রাকৃতিক গ্যাস সঞ্চালন এবং টেলিযোগাযোগ সমন্বিত করার অপুর্ব সুযোগ করে দিয়েছে। টাঙ্গাইল থেকে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত বিস্তৃত এই সেতু এশীয় মহাসড়ক ও আন্তঃএশীয় রেলপথের উপর অবস্থিত। এ দুটি সংযোগপথের কাজ শেষ হওয়ায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে উত্তর-পশ্চিম ইউরোপ পর্যন্ত অবিচ্ছিন্ন আর্ন্তজাতিক সড়ক ও রেলসংযোগ স্থাপিত হয়। সেতুটি নির্মাণে মোট খরচ হয় ৯৬২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। আইডিএ, জাপানের ওইসিএফ প্রত্যেকে ২২ শতাংশ পরিমাণ তহবিল সরবরাহ করে এবং বাকি ৩৪ শতাংশ ব্যয় বহন করে বাংলাদেশ। সেতুটির দৈর্ঘ্য ৪.৮ কিঃ মিঃ এবং প্রস্থ ১৮.৫ মিঃ। যমুনা নদীর প্রধান চ্যানেলের প্রস্থ ৩.৫ কিলোমিটারের বেশি নয়। এই বিষয়টি মাথায় রেখে এবং বন্যাজনিত কারণের জন্য আরও কিছুটা প্রশ্বস্ততা বাড়িয়ে ৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের একটি সেতু যথেষ্ট বলে বিবেচনা করা হয়। ভৌত অবকাঠামোর কাজ শুরু করার এক বছর পর ১৯৯৫ সালের অক্টোবর মাসে সেতুটির মূল অংশ ৪.৮ কিরোমিটার ধরে চূড়ান্ত প্রকল্প অনুমোদিত হয়। যদিও বন্যায় নদী ১৪ কিলোমিটার পর্যন্ত প্রশস্ত হয়ে থাকে, সার্বিক প্রকল্প ব্যয় অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক অবস্থায় রাখার জন্য উক্ত সংকোচন অত্যাবশক বিবেচনা করা হয়। এ জন্য অবশ্য নদীর প্রবাহ সেতুর নিচ দিয়ে সীমাবদ্ধ রাখার উদ্দেশ্যে নদী শাসনের প্রয়োজন দেখা দেয়। সম্ভাব্য দৈব দুর্বিপাক ও ভুমিকম্প যাতে সহ্য করতে পারে সেজন্য সেতুটিকে ৮০-৮৫ মিটার লম্বা এবং ২.৫ ও ৩.১৫ মিটার ব্যাসের ১২১টি ইস্পাতের খুঁটির উপর বসানো হয়েছে। এই খুঁটিগুলি খুবই শক্তিশালী (২৪০টন) হাইড্রোলিক হাতুড়ি দ্বারা বসানো হয়। সেতুটিতে স্প্যানের সংখ্যা ৪৯ এবং ডেক খন্ডের সংখ্যা ১,২৬৩। সেতুটির উপর দিয়ে ৪ লেনের সড়ক এবং ২টি রেলট্র্যাক নেওয়া হয়েছে। সেতুটির উপরিকাঠামো ঢালাই করা খন্ডাংশ দিয়ে তৈরি এবং এগুলি সুস্থিত খিলান পদ্ধতিতে বসানো হয়েছে। সেতুটি নির্মাণে সর্বমোট যে ব্যয় হয় মিলিয়ন ডলারে তার বিভাজন হচ্ছে; সেতু এবং তার উপরে তৈরি পথসমূহ-২৬৯, নদীশাসন-৩২৩, রাস্তা ও বাঁধসমূহ-৭১, উপদেষ্টা- ৩৩, ভূমি অধিগ্রহণ, পুনর্বাসন এবং পরিবেশ সংরক্ষণ -৬৭, সংস্থাপন-১৩, এবং অন্যান্য ১৮৬। উপমহাদেশের এই অংশের জনগণ সর্বদাই বিশাল যমুনা নদীর উপর দিয়ে সেতু স্থাপনের মাধ্যমে গোটা দেশের সঙ্গে এই অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা সমন্বয়ের আকাঙ্খা পোষণ করে এসেছে। ১৯৪৯ সালে জননেতা আবদুল হামিদ খান ভাসানী প্রথম রাজনৈতিক পর্যায়ে যমুনা সেতু নির্মাণের দাবি উত্থাপন করেন। ১৯৫৪ সালে পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক নির্বাচনের সময় যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা নির্বাচনী ইশতেহারে এই সেতু নির্মাণের কথা অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৯৬৪ সালের ৬ জানুয়ারী রংপুর থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য মোহাম্মদ সাইফুর রহমান যমুনা নদীর উপর সরকারের সেতু নির্মাণের কোন ইচ্ছা আছে কি-না জানতে চেয়ে প্রাদেশিক পরিষদে প্রশ্ন উত্থাপন করেন। ১৯৬৬ সালের ১১ জুলাই রংপুর থেকে একই পরিষদের আরেকজন সদস্য শামসুল হক এই সেতু নির্মাণের জন্য একটি প্রস্তাব পেশ করেন এবং এটি সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। ১৯৬৯ সালে যুক্তরাজ্যের ফ্রিমান ফক্স অ্যান্ড পার্টনার্স নামে একটি প্রতিষ্ঠান সেতুটির প্রাথমিক সম্ভাব্যতা নিয়ে সমীক্ষা পরিচালনা করে। তারা সিরাজগঞ্জের নিকট আনুমানিক ১৭৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে একটি রেল-কাম-সড়কসেতু নির্মাণের সুপারিশ করেন। এই সমীক্ষা ছিল প্রাথমিক ধরনের এবং তারা বিস্তারিত সমীক্ষা পরিচালনার সুপারিশ করেন। অন্যদিকে ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনের প্রাক্কালে বেতার-টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণদানকালে আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবর রহমান তাঁর দলের নির্বাচনী ওয়াদা হিসেবে যমুনা সেতু নির্মাণের কথা উত্থাপন করেন। এ সকল প্রচেষ্টা তৎকালীন রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং মুক্তিযুদ্ধের কারণে বাস্তবায়িত হতে পারে নি। স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগ সরকার ১৯৭২ সালে যমুনা নদীর উপর একটি সেতু নির্মাণের ঘোষণা দেয় এবং ১৯৭২-৭৩ সালের বাজেটে এজন্য বরাদ্দ রাখা হয়। বাংলাদেশ সরকারের আমন্ত্রণে জাপান আর্ন্তজাতিক সহযোগিতা সংস্থা জাইকা ১৯৭৩ সালে যমুনা নদীর উপর একটি সড়ক-কাম-রেলসেতু নির্মাণের সম্ভাব্যতা-সমীক্ষা হাতে নেয়। ১৯৭৬ সালে জাপান তাদের সমীক্ষা শেষ করে। তারা বলে যে যমুনা প্রকল্পে ৬৮৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় হবে এবং এর অর্থনৈতিক আগমের হার মাত্র ২.৬ শতাংশ। যেহেতু এটা প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে লাভজনক নয়, তৎকালীন সরকার প্রকল্পটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করে। ১৯৮২ সালে সরকার যমুনা সেতু প্রকল্প পুনরুজ্জীবিত করে। এ সময় সরকার যমুনার ওপারে পশ্চিমাঞ্চলে প্রাকৃতিক গ্যাস সঞ্চালনের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য একটি সমীক্ষা দল নিয়োগ করে। সমীক্ষার উপসংহারে বলা হয় যে, শুধু গ্যাস সংযোগ অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হবে না। উপদেষ্টাগণ একটি সড়ক-কাম-গ্যাস পরিবাহক সেতুর প্রকৌশলগত সম্ভাব্যতা ও এর ব্যয় নির্ধারণ করেন। এভাবেই বহুমুখী সেতু নির্মাণের প্রাথমিক ধারণার উৎপত্তি হয়। তিন লেন বিশিষ্ট ১২ কিঃ মিঃ দীর্ঘ সেতুর প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয় ৪২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। মন্ত্রিসভা এই রিপোর্ট অনুমোদন করে এবং এই প্রকল্পের অনুকূলে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য একটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এই প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ১৯৮৫ সারের ৩ জুলাই রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ বলে যমুনা বহুমুখী সেতু কর্তৃপক্ষ গঠিত হয়। অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে যমুনা সেতু সারচার্জ ও লেভি আদায়ের জন্য আরেকটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়। অধ্যাদেশটির বিলুপ্তি পর্যন্ত এই প্রক্রিয়ায় ৫.০৮ বিলিয়ন টাকা সংগ্রহ করা হয়। ১৯৮৬ সালে এই সেতুর জন্য প্রথম পর্যায়ের সম্ভাব্যতা-সমীক্ষা পরিচালনা করা হয়। এ সময় সিরাজগঞ্জ ও ভূয়াপুর (টাঙ্গাইল) মর্ধবর্তী স্থানকে সেতুর জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত স্থান বলে চিহ্নিত করা হয়। ১৯৮৭ সালের মধ্যে দ্বিতীয় পর্যায়ের সম্ভাব্যতা-সমীক্ষা পরিচালিত হয়। এতে দেখা যায় যে একটি সড়ক-কাম-রেল-বিদ্যুৎ-গ্যাস লাইন পরিবাহী সেতু অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত উভয় দিক থেকেই লাভজনক হবে। ১৯৯২ সালে আইডিএ, এডিবি ও জাপানের ওইসিএফ সেতুর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়নে সম্মত হয়। নির্মাণ চুক্তির জন্য ১৯৯৩ সালে আন্তর্জাতিক বিডিং এর মাধ্যমে দরপত্র আহবান করা হয়। সেতু নির্মাণ, নদী শাসনের কাজ এবং দুটি সংযোগ সড়ক নির্মাণ কাজের চুক্তি ১৯৯৪ সালের মার্চ মাসে সম্পাদিত হয়। ১৯৯৪ সালের ১০ এপ্রিল সেতুর ভিত্তি প্রস্তর স্থাপিত হয়। ১৯৯৪ সারের ১৫ অক্টোবর প্রকল্পের ভৌত নির্মাণ কাজ বাস্তবায়ন শুরু হয় এবং গ্যাস সঞ্চালন লাইন ব্যতীত সকল কাজ ১৯৯৮ সালের জুনের মধ্যে শেষ হয়। ১৯৯৮ সালের ২৩ জুন সেতুটি চলাচলের জন্য উম্মুক্ত করা হয়।

মখদুম শাহের মাজারঃ
বাংলার আউলিয়া-দরবেশের মধ্যে মখদুম শাহ খুবই পরিচিতি ও শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিত্ব। সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুরে পুরানো শাহী মসজিদের পাশ্ববর্তী কবরস্থানে তিনি শায়িত আছেন। স্থাপত্য রীতির বিবেচনায় বলা যায় যে, শাহজাদপুর মসজিদটি মুঘলপূর্ব যুগে নির্মিত। মসজিদটির গাত্রে কোন অভিলেখ না থাকায় এর নির্মাণ তারিখ নিশ্চিতভাবে বলা যাবে না। এ কারণে এবং লিখিত সাক্ষ্যের অনুপস্থিতিতে দরবেশ মখদুম শাহ এর পরিচিতি ও ইতিহাস সঠিক ভিত্তির উপর দাঁড় করানো সম্ভব নয়। এতদঞ্চলে প্রচলিত জনশ্রুতিই মখদুম শাহ সমন্ধে জানার একমাত্র উৎস। প্রায় একশত বছর পূর্বে এ কাহিনী সংগ্রহ করে কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটি পত্রিকায় প্রকাশ করা হয়। প্রচলিত কাহিনী অনুযায়ী ইয়েমেনের জনৈক রাজা মুয়াজ বিন জবলের এক কন্যা ও দুই পুত্রের একজন ছিলেন মখদুম শাহ দৌলাহ। পিতার অনুমতি নিয়ে তিনি নিজে এবং আরও বারোজন আউলিয়াসহ বিধর্মীদের দেশে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে বের হন। এছাড়া স্বীয় বোন এবং খাজা কালাম দানিশমন্দ, খাজা নুর ও খাজা আনোয়ার নামে তাঁর তিন ভাগনে তাঁর সঙ্গী হয়েছিলেন। পথিমধ্যে বোখারাত শেক জালালুদ্দীন বোখারীর সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। শুভেচ্ছার নিদর্শন স্বরূপ তিনি মখদুম শাহকে ধুসর রঙের এক জোড়া কবুতর উপহার দেন। বোখারা থেকে দলটি বাংলা অভিমুখে যাত্রা করে। তিনি দলবলসহ বাংলায় এসে জনৈক হিন্দু রাজার শাসনাধীন শাহজাদপুর নামক লোকালয়ে বসবাস শুরু করেন। ঐ রাজার রাজ্য বিহার পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। মখদুম শাহ ও তাঁর অনুসারীদের উৎখাত করার জন্য রাজা আদেশ দেন। ফলে দু’দলের মধ্যে তীব্র যুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধে খাজা নুর ব্যতীত মখদুম শাহ ও তাঁর অন্যান্য সাথী শাহাদত বরণ করেন। এ বিষাদময় ঘটনা থেকে পরিত্রাণ পেয়ে পরবর্তী সময়ে খাজা নুর সোনারগাঁও এর এক রাজকুমারীকে বিয়ে করেন। শাহজাদপুর পরিবার যারা মখদুম শাহ দৌলার বংশ বলে দাবি করে আসছে, তারা সম্ভবত খাজা নুর ও সোনাগাঁয়ের রাজকুমারীর বংশধর।

মখদুম শাহ দৌলাহ যে পরিবেষ্টিত প্রাঙ্গণে শায়িত আছেন ঠিক সেখানে শাহ ইউসুখের সামাধি সৌধ অবস্থিত। মখদুম শাহের অন্যান্য অনুসারীদের পাশে একটি আঙ্গিনায় কবর দেওয়া হয়। শামসুদ্দীন তাব্রিজিকে (প্রখ্যাত ‘মসনভি’ রচয়িতা মেশ জালালুদ্দীন রুমির শিক্ষক শামসুদ্দীন তাব্রিজি নন। তিনি কখনও বাংলায় এসেছেন বলে জানা যায় না) শাহ দৌলাহ শহীদের অনুসারী বলে ধরা হয়। পৃথক অন্য একটি আঙ্গিনায় শামসুদ্দীন তাব্রিজি শায়িত আছেন। অন্যান্যরা যাঁদেরকে মখদুম শাহীর অনুসারি ধরা হয় এবং যাঁদের সমাধি একই অঙ্গিনায় অবস্থিত তাঁরা হলেন শাহ খিনগার, শাহ আজমল, হাসিল পীর , শাহ বোদলা, শাহ আহমদ এবং শাহ মাহমুদ। তাঁর অন্যান্য কিছু সহচরদের গণকবর দেওয়া হয় এবং তা গঞ্জ-ই-শাহীদান নামে পরিচিত। মখদুম শাহের বোন নিকটবর্তী নদীতে ঝাপ দিয়ে আত্নহত্যা করেন এবং ঐ জায়গাটি এখনও ‘সতীবিবির ঘাট’ নামে পরিচিত। যেহেতু মখদুম শাহ ইয়েমেনের রাজ্যের শাহজাদা নামে পরিচিত, তাই তাঁর নামানুসারে স্থানাটির নামকরণ করা হয় শাহজাদপুর। মুসলিম আমলে শাহজাদপুর পরগনা ইউসুফশাহীর অন্তর্ভুক্ত ছিল। ইউসুফ শাহ এর নামানুসারে এ পরগনার নামকরণ করা হয়। ৭২২ বিঘা জমি নিয়ে একটি বিরাট এস্টেট শাহজাদপুর দরগাহ ও মসজিদের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দান করা হয়। এ এস্টেট এখনও মখদুম শাহের ভাগনে খাজা নুরের বংশধরেরা ভোগ-দখল করছেন। মখদুম শাহ দৌলাহর বাংলায় আগমনের তারিখ নির্ণয় করা যায়নি। প্রচলিত কাহিনী অনুসারে, তুর্কি আক্রমনের পূর্বে দ্বাদশ শতাব্দীতে তিনি এবং তাঁর সহচরগণ বাংলায় আসেন বলে ইঙ্গিত পাওয়া যায়। অবশ্য আধুনিক পন্ডিতগণ এ ধারণার ব্যাপারে সন্দিহান । ইয়েমেনের সুলতান মুয়াজ বিন জবলকে সনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। এক মুয়াজ বিন জবল নবী হযরত মুহম্মদ (সঃ)-এর সাহাবি ছিলেন। তিনি ১৭ বা ১৮ হিজরিতে মারা যান। তাই নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, লোককাহিনীর মুয়াজ এবং মুহম্মদ (সঃ)-এর সাহাবি মুয়াজ কোনক্রমেই অভিন্ন ব্যক্তি নন। জালালউদ্দিন বোখারী, যাঁর সঙ্গে মখদুম শাহের দেখা হয়েছিল বলা হয় তিনি ১২৯১ সালে মৃত্যুবরণ করেন। অতএব, এ ব্যাপারে কালের পরিপ্রেক্ষিতে ধারণা করা হয় যে, মখদুম শাহ চতুর্দশ শতাব্দীর পূর্বে বাংলায় আসেননি এবং নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে, বখতিয়ারের বাংলা বিজয়ের পর তিনি এদেশে আসেন। শাহজাদপুর দরগাহে প্রতি বছর চৈত্র মাসে (মধ্য-এপ্রিল) এক মাসব্যাপী মেলা হয়। মেলার সময় এখানে সকল সম্প্রদায়ের লোকের সমাগম হয়। দরগায় উৎসর্গীকৃত সামগ্রীর মধ্যে চাল, চিনি, মিষ্টি, মোরগ এবং চেরাগ (এক ধরণের ব্রতমূলক বাতি) প্রধান।

রবীন্দ্র-কাচারিবাড়ি
শাহজাদপুরের আর একটি বিখ্যাত ও জনপ্রিয় পুরাকীর্তি হচ্ছে বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শাহজাদপুরের কাচারিবাড়ী। এটি রবীন্দ্রনাথের পৈতৃক জমিদারি তত্ত্বাবধানের কাচারি ছিল। তারও পূর্বে অষ্টাদশ শতাব্দীতে এটি নীলকরদের নীলকুঠি ছিল। সে কারনে এখনও অনেকে একে কুঠিবাড়ী বলে। পরে রবীন্দ্রনাথের দাদা প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর এটি নিলামে কিনে নেন। এখানে রয়েছে জমিদারির খাজনা আদায়ের কাচারির একটি ধ্বংসাবশেষ, একটি বেশ বড় দ্বিতল ভবন। বর্তমানে এখানে নির্মিত হয়েছে একটি আধুনিক অডিটোরিয়াম। দ্বিতল ভবনটি বর্তমানে রবীন্দ্র জাদুঘর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং আঙ্গিনার বিস্তৃত জায়গা জুড়ে তৈরী করা হয়েছে সুদৃশ্য একটি ফুলবাগান। রবীন্দ্রনাথ পিতার আদেশে ঊনত্রিশ বছর বয়সে ১৮৯০ সালে জমিদারি তত্ত্বাবধানের জন্য প্রথম শাহজদাপুর আসেন। রবীন্দ্রনাথ এখানকার প্রকৃতি ও মানুষের বিচিত্র জীবন প্রবাহের সৌন্দর্য দেখে অভিভূত হন। এখানে এসে তার লেখা একটি কবিতায় তিনি বলেছেন,

‘‘নদী ভরা কূলে কূলে, ক্ষেত ভরা ধান।
আমি ভাবিতেছি বসে কি গাহিব গান।
কেতকী জলের ধারে
ফুটিয়াছে ঝোপে ঝাড়ে,
নিরাকুল ফুলভারে বকুল-বাগান।
কানায় কানায় পূর্ণ আমার পরাণ’’
(ভরা ভাদরে- সোনার তরী)

রবীন্দ্রনাথ ১৮৯০ থেকে ১৮৯৬ মোট ৭ বছর জমিদারির কাজে শাহজাদপুরে আসা-যাওয়া এবং অবস্থান করেছেন। তার এই শাহজাদপুরে আসা-যাওয়া শুধু জমিদারি তত্ত্বাবধানের বস্তুনিষ্ঠ প্রয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বরং এই জমিদারির প্রয়োজনকে ছাপিয়ে প্রাধান্য পেয়েছে কবির সাহিত্য সৃষ্টির অনুপ্রেরণা ও সৃজনশীলতা। এই সময়ের মধ্যে এখানে তিনি তাঁর অনেক অসাধারণ কালজয়ী সাহিত্য রচনা করেছেন। এর মধ্যে ‘সোনার তরী’ কাব্যের ‘ভরা ভাদরে’, ‘দুইপাখি’ ‘আকাশের চাঁদ’, ‘হৃদয় যমুনা’, ‘প্রত্যাখ্যান’, ‘বৈষ্ণব কবিতা’, ‘পুরস্কার’ ইত্যাদি অসাধারণ কবিতা রচনা করেছেন। ‘চৈতালী’ কাব্যের ‘নদীযাত্রা’, ‘শুশ্রূষা’,‘ইছামতি নদী’, ‘বিদায়’, ‘আশিস-গ্রহণ’ ইত্যাদি কবিতা এবং ‘কল্পনা’ কাব্যের ‘যাচনা’, , ‘বিদায়’, ‘নরবিরহ’, ‘মানস-প্রতিমা’, ‘লজ্জিতা’, ‘সংকোচ’, ইত্যাদি বিখ্যাত গান রচনা করেছেন। তাঁর শাহজাদপুরে রচিত ছোটগল্পের মধ্যে ‘পোষ্টমাস্টার’, ‘ছুটি’, ‘সমাপ্তি’, ‘অতিথি’ ইত্যাদি বিখ্যাত। আর প্রবন্ধের মধ্যে ‘ছেলে ভুলানো ছড়া’, ‘পঞ্চভূত’, এর অংশবিশেষ এবং ‘ছিন্নপত্র’ ও ছিন্নপত্রাবলীর আটত্রিশটি পত্র রচনা করেছেন। এছাড়া তার ‘বিসর্জন’ নাটকও এখানে রচিত। সবচেয়ে বড় কথা, তার পরবর্তী সাহিত্য সৃষ্টির ক্ষেত্রে শাহজাদপুরের প্রভাব বিশেষভাবে বিদ্যমান। ঠাকুর পরিবারে জমিদারি ভাগাভাগির ফলে শাহজাদপুরের জমিদারি চলে যায় রবীন্দ্রনাথের অন্য শরীকদের হাতে। তাই ১৮৯৬ সালে তিনি শেষ বারের মতো শাহজাদপুর থেকে চলে যান। এর পরে তিনি আর শাহজাদপুরে আসেননি। শাহজাদপুর ছিল রবীন্দ্রনাথের অত্যান্ত প্রিয় এবং ভালোবাসার একটি স্থান। তাঁর ভালোবাসার কথা তিনি বিভিন্ন লেখায় বিশেষ করে ‘ছিন্নপত্র’ ও ‘ছিন্নপত্রাবলী’তে গভীর আবেগ এবং আন্তরিকতার সাথে উল্লেখ করেছেন। ১৮৯৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর শাহজাদপুর থেকে লেখা একটি চিঠিতে তিনি স্পষ্টই বলেছেন, ‘‘ এখানে (শাহজাদপুরে) যেমন আমার মনে লেখার ভাব ও ইচ্ছা আসে এমন কোথাও না।’’ (ছিন্নপত্র- পত্র সংখ্যা-১১৯) এছাড়াও অন্যান্য লেখাতেও শাহজাদপুর সম্পর্কে তাঁর আবেগময় ভালোবাসার কথা ব্যক্ত করেছেন। তাঁর মৃত্যুর এক বছর আগে ১৯৪০ সালে শাহজাদপুরের তৎকালীন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হরিদাস বসাকের চিঠির জবাবে তিনি লিখেছেন,‘শাহজাদপুরের সাথে আমার বাহিরের যোগসূত্র যদিও বিচ্ছিন্ন তবুও অন্তরের যোগ নিবিড়ভাবে আমার স্মৃতির সঙ্গে জড়িত। আমার প্রতি সেখানকার অধিবাসীদের শ্রদ্ধা এখনো যদি অক্ষুন্ন থাকে তবে আমি পুরস্কার বলে গণ্য করব’’ (শাহজাদপুরে রবীন্দ্রনাথ-মোহাম্মদ আনসারুজ্জামান)। শাহজাদপুরের প্রতি রবীন্দ্রনাথের এই ভালবাসা একে দিয়েছে মর্যাদা ও গৌরবের এক ভিন্ন মাত্রা। শাহজাদপুরও রবীন্দ্রনাথকে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সাথে হৃদয়ে লালন করছে। প্রতিদিন দেশ বিদেশ থেকে বহু দর্শনার্থী কবির স্মৃতিধন্য এই স্থানটি দর্শনে আসেন। এছাড়া প্রতি বছর সরকারি উদ্যোগে সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসনের আয়োজনে তিন দিন ব্যাপী ব্যাপক অনুষ্ঠানমালার মাধ্যমে যথাযোগ্য মর্যাদায় ও উৎসাহ উদ্দীপনার সাথে রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তী পালিত হয়। এই জন্মজয়ন্তী অনুষ্ঠানে হাজার হাজার মানুষের ঢল নামে। রবীন্দ্র-কাচারিবাড়ীর মিলনায়তনে কোনভাবেই স্থান সংকুলান হয় না। তাই একান্ত প্রয়োজন দেখা দিয়েছে একটি রবীন্দ্র মুক্ত মঞ্চের। কাচারিবাড়ীর দক্ষিণ-পশ্চিমাংশে একটি মুক্তমঞ্চ নির্মাণের মতো যথেষ্ট জায়গা রয়েছে। কাচারিবাড়ীর প্রত্নতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য ও সৌন্দর্য অক্ষুন্ন রাখার জন্য যা কিছু প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ তা জরুরী ভিত্তিতে গ্রহণ করার পরামর্শ সুধী মহলের। সাম্প্রতিককালে শাহজাদপুরে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের দাবী দলমত নির্বিশেষে এখানকার সব মানুষের প্রাণের দাবীতে পরিণত হয়েছে। উল্লেখ্য, আমাদের জাতীয় সঙ্গীতের রচয়িতা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের নামে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা অন্য কোন প্রতিষ্ঠান আছে বলে জানা নেই।

চলন বিল
চলন বিল বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বিল এবং সমৃদ্ধতম জলাভূমিগুলির একটি। দেশের সর্ববৃহৎ এই বিলটি বিভিন্ন খাল বা জলখাত দ্বারা পরস্পর সংযুক্ত অনেকগুলি ছোট ছোট বিলের সমষ্টি। বর্ষাকালে এগুলি সব একসঙ্গে একাকার হয়ে প্রায় ৩৬৮.০০ বর্গ কিমি এলাকার একটি জলরাশিতে পরিণত হয়। বিলটি সংলগ্ন তিনটি জেলা নাটোর, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ এর অংশ বিশেষ জুড়ে অবস্থান করছে। চলন বিল সিরাজগঞ্জ জেলার রায়গঞ্জ ও পাবনা জেলার চাটমোহর উপজেলা দুটির অধিকাংশ স্থান জুড়ে বিস্তৃত। এছাড়া সিরাজগঞ্জ জেলার তাড়াশ থানার তিন চতুর্থাংশই এ বিলের মধ্যে অবস্থিত। বিলটির দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্ত পাবনা জেলার নুননগরের কাছে অষ্টমনীষা পর্যন্ত বিস্তৃত। এ জেলায় চলন বিলের উত্তর সীমানা হচ্ছে সিংড়ার পূর্ব প্রান্ত থেকে ভদাই নদী পর্যন্ত টানা রেখাটি যা নাটোর, পাবনা ও বগুড়া জেলার মধ্যবর্তী সীমানা নির্দেশ করে। ভদাই নদীর পূর্ব পাড়ে অবস্থিত তাড়াশ উপজেলা ও পাবনা জেলা বরাবর উত্তর-দক্ষিণমূখী একটি রেখা টানলে তা হবে বিলটির মোটামুটি পূর্ব সীমানা। বিলটির প্রশস্ততম অংশ উত্তর-পূর্ব কোণে তাড়াশ থেকে গুমনী নদীর উত্তর পাড়ের নারায়ণপূর পর্যন্ত প্রায় ১৩ কিমি বিস্তৃত। সিংড়া থেকে গুমনী পাড়ের কচিকাটা পর্যন্ত অংশে এটির দৈর্ঘ্য সবচেয়ে বেশি, ২৪ কিমি। ব্রহ্মপুত্র নদ যখন তার প্রবাহপথ পরিবর্তন করে বর্তমান যমুনায় রূপ নেয়, সে সময়েই চলন বিলের সৃষ্টি। করতোয়া ও আত্রাই নদীর পরিত্যাক্ত গতিপথ অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে একটি ব্যাপক বিস্তৃত হ্রদে পরিণত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত এটি সম্ভবত একটি পশ্চাৎজলাভূমি ছিল। চলন বিলের গঠন ঐতিহাসিকভাবেই আত্রাই ও বড়াল নদীর সংকোচনের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। আত্রাই নদী ছিল চলন বিলের প্রধান যোগানদাকারী প্রণালী যা রাজশাহী জেলার উত্তরাংশ ও দিনাজপুর এলাকার জল নিস্কাশন করত। বড়াল চলন বিল থেকে জল নির্গমন পথ হিসেবে কাজ করে এবং বিলের পানি বহন করে যমুনা নদীতে ফেলে। গঠিত হওয়ার সময় চলন বিলের আয়তন ছিল প্রায় ১,০৮৮ বর্গ কিমি। চলন বিলের দক্ষিণ প্রান্ত ঘেঁষে রয়েছে গুমনী নদী যা বিলটির পানি বয়ে নিয়ে প্রথমে বড় বিলে ফেলে এবং শেষ পর্যন্ত যমুনায় পতিত হয়। যমুনা বন্যা প্লাবিত হয়ে পানির উচ্চতা বেড়ে গেলে বড়াল সেই পানি কিছুটা ধরে রাখে এবং বিলের পানিও বেড়ে যায়; যমুনার পানি নেমে না যাওয়া পর্যন্ত পানির এই উচ্চতা কমে না। শুষ্ক মৌসুমে বিলের বৃহত্তর অংশ শুকিয়ে ২৫.৯ থেকে ৩১.০৮ বর্গ কিমি আয়তনের এক জল গহবরে পরিণত হয়, যাকে বিলের ‘মুল অংশ’ বলা যেতে পারে। এই মুল অংশ অবশ্য অব্যাহত পানি সরবরাহ থেকে বঞ্চিত, বরং কিছু সংখ্যক অগভীর জলাশয়ের সমষ্টি যা পরস্পর অত্যন্ত আঁকাবাঁকা কিছু খাল দ্বারা সংযুক্ত। এই মূল অংশকে ঘিরে দুটি এককেন্দ্রিক অসম ডিম্বাকার এলাকা আছে যেখানে আঞ্চলিকভাবে ‘ভাসমান ধান’ নামে পরিচিত সরু চালের ধান উৎপন্ন হয়। বর্তমানে চলন বিল দ্রুত ভরাট হয়ে যাচ্ছে। প্রতি বছর গঙ্গা থেকে পলি এসে পড়ার দরুন বিগত দেড়শ বছরে বিলটি দক্ষিণ দিক থেকে অন্ততপক্ষে ১৯.৩২ কিমি সরে এসেছে। বিলটিতে প্রবাহদানকারী নদীগুলি, যথা গুড়, বড়াল ইত্যাদিও এটির আয়তন সংকোচনের ক্ষেত্রে যথেষ্ট ভূমিকা রাখছে। বিলটির পানি নিষ্কাশন প্রণালী এবং পলি সঞ্চলের বিষয়টি অনুসন্ধান করে দেখার জন্য গণপূর্ত বিভাগ ১৯০৯ সালে একটি জরিপ চালিয়ে দেখেছে যে, চলন বিল তার পূর্বেকার আয়তন ১,০৮৫.০০ বর্গ কিমি থেকে সংকুচিত হয়ে ৩৬৮.০০ বর্গ কিমি এ দাড়িয়েছে। অবশিষ্ট জমি ব্যবহৃত হয়েছে চাষাবাদ অথবা জনবসতির জন্য। এই হ্রাসপ্রাপ্ত এলাকার মাত্র ৮৫ বর্গ কিমি -এ সারা বছর ধরে পানি থাকে। চলন বিল বেশ দ্রুত ভরাট হয়ে আসছে। জমি পুনরুদ্ধার হচ্ছে এবং বিলের ধার দিয়ে গড়ে উঠছে গ্রাম। কেবল কেন্দ্রের গভীরতম অংশটুকু ছাড়া শুকনো মৌসুমে সমস্ত ছোট-বড় বিল শুকিয়ে যায়। কেন্দ্রের বাইরে প্রান্তীয় এলাকাগুলিতে শুষ্ক মৌসুমে বোরো ও উচ্চ ফলনশীল ধান চাষ করা হয়। বর্ষার সময় অগভীর প্রান্তীয় এলাকায় গভীর পানির আমন ধান চাষ করা হয়। উত্তরবঙ্গের মাছের চাহিদা পূরণে চলনবিল এখনও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।

মিল্কভিটা
মিল্কভিটা Bangladesh Milk Producers Co-operative Union Limited (BMPCUL) নামক সংস্থার তৈরী দুগ্ধজাত সামগ্রীর ট্রেড-মার্কের নাম। সমবায়ের আওতায় প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানটি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে দুধ সংগ্রহ করে শহরবাসীর দুগ্ধ ও দুগ্ধজাত সামগ্রীর চাহিদা পূরণে সচেষ্ট রয়েছে। বাংলাদেশের বৃহত্তম দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রতিষ্ঠান মিল্কভিটার সবচেয়ে বড় কারখানাটি শাহজাদপুরের বাঘাবাড়িতে অবস্থিত। এই কারখানায় দুধ প্রক্রিয়াজাতকরণ ছাড়াও দুগ্ধজাত ঘি, মাখন, দই, আইসক্রিমসহ নানা ধরনের পণ্যের উৎপাদন হচ্ছে। মিল্কভিটার প্রায় শতকরা ৮০ ভাগ দুধ শাহজাদপুরের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষকদের দুগ্ধ খামার থেকে সংগ্রহ করা হয়। এই দুগ্ধ খামারের সংখ্যা প্রায় ৮,৪৬৮টি। এসব খামারে উন্নত জাতের গাভী পালন করা হয় এবং কোন কোন গাভী থেকে দিনে প্রায় ৩০ লিটার দুধ পাওয়া যায়। এখানে প্রচুর দুধ পাওয়া যায় বলে দুগ্ধজাত মিষ্টান্ন ও অন্যান্য খাদ্য তৈরী শিল্প গড়ে উঠেছে ব্যাপক হারে। বর্তমানে BMPCUL দেশের ছয়টি দুধ উৎপাদক এলাকা টাঙ্গাইল, টেকেরহাট, বাঘাবাড়ি, রংপুর ও শ্রীনগরে কাজ করে। নিজেদের প্রাথমিক সমবায় সমিতিগুলির প্রতিষ্ঠিত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে দুধ সংগৃহীত হয়। নগদ অর্থের বিনিময়ে সদস্যরা দিনে দুবার সমিতিকে দুধ যোগান দেয়, তবে স্থানীয় বাজার-বারে সাপ্তাহিক পাওনা পরিশোধই অধিকতর সুবিধাজনক। দুধে বিদ্যমান চর্বি ও অন্যান্য উপাদানের অনুপাতেই দুধের দাম নির্ধারিত হয়। সমিতিতে সংগৃহীত দুধ প্রাথমিক প্রসেসিংয়ের জন্য নিকটতম কারখানায় পৌছানো হয়। টাঙ্গাইল, টেকেরহাট ও শ্রীনগর অঞ্চলের দুধ ঢাকায় আসে এবং তা থেকে তরল দুধ, আইসক্রিম ও দই প্রস্তুত করা হয়। বাঘাবাড়ি ঘাটের দুধ থেকে বাঘাবাড়ি ঘাটের ডেইরি কারখানা গুঁড়াদুধ, মাখন, দই ও ঘি উৎপাদন করে। সংস্থার দুগ্ধজাত সামগ্রী ‘মিল্ক ভিটা’ ট্রেডমার্ক নামে বাজারজাত হয়।

বাঘাবাড়ি নদী বন্দর
সরকার নির্ধারিত দায়িত্বের অংশ হিসেবে অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন খাতের উন্নয়ন তত্ত্বাবধানের ধারায় বিআইডাব্লিউটিএ অভ্যন্তরীণ নৌবন্দরসমূহের উন্নয়নের প্রকল্প হাতে নেয়। প্রাথমিক পর্যায়ে ঢাকা, নারায়নগঞ্জ, চাঁদপুর, বরিশাল এবং খুলনায় পাঁচটি প্রধান অভ্যন্তরীণ বন্দর প্রতিষ্ঠিত হয়। সরকার ১৯৬০ সালের ৯ সেপ্টেম্বর তারিখের ৪৬২-এইচটিডি নং গেজেট নোটিফিকেশন দ্বারা ১৯০৮ সালের বন্দর আইনের প্রবিধানসমূহ এই পাঁচটি অভ্যন্তরীণ নৌবন্দরের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বলে ঘোষণা করেন। পরবর্তী সময়ে আইডব্লিউটি খাতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে ছয়টি নতুন অভ্যন্তুরীণ নদীবন্দর প্রতিষ্ঠা করা হয় পটুয়াখালী (১৯৭৫), নগরবাড়ি (১৯৮৩), আরিচা (১৯৮৩), দৌলতদিয়া (১৯৮৩), বাঘাবাড়ি (১৯৮৩) এবং নরসিংদী (১৯৮৩)। সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলায় বড়াল নদীর তীরে স্থাপিত হয়েছে বাঘাবাড়ি নদী বন্দর। বাঘাবাড়ি নদী বন্দরের পেট্রোলিয়াম ডিপো থেকে পেট্রোলিয়াম জাতীয় দ্রব্য এবং সার সরবরাহের মধ্য দিয়ে কোটি কোটি টাকার লেনদেন হয়। এই বন্দরটি সিরাজগঞ্জের অর্থনীতিতে বিরাট ভূমিকা রাখছে।

হৃড়াসাগর নদী
আত্রাই-বড়াল এবং ফুলজোড় (বাব্দালী-করতোয়া)-এর সম্মিলিত স্রোতধারা। চলন বিলের পূর্ব প্রান্তে চাঁচকইর নামক স্থানে গুমানী নদীর গুর নদীর সঙ্গে মিলিত হয়ে গুমানি নামে প্রবাহিত হয়। চাটমোহরের পূর্ব দিকে এসে এটি বড়ালের সঙ্গে মিলিত হয়ে বড়াল (আত্রাই-বড়াল) নামে প্রবাহিত হয়েছে। চাটমোহর থেকে ৪৮ কিঃ মিঃ পূর্ব-দক্ষিণে বাঘাবাড়ির কাছে এই আত্রাই-বড়াল নদী তার বাম তীরে ফুলঝোড় (বাঙ্গালী-করতোয়া) নদীকে ধারন করে এবং মিলিত প্রবাহ হুড়াসাগর নামধারণ করে পূর্ব-দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হচ্ছে। বেড়া পুলিশ স্টেশনের কাছে হুড়াসাগর তার ডান তীরে ইছামতি নদীর প্রবাহকে ধারণ করে যমুনা নদীতে পতিত হয়েছে। বাঘাবাড়ি থেকে কিছুটা ভাটিতে বেড়া বাজারের সামান্য উত্তর-পশ্চিমে একটি বিরাট বহুমূখী সেচ প্রকল্পের নির্মাণ কাজ চলছে । এখানে একাধারে সেচ কাজের জন্য পানি হুড়াসাগর থেকে নিয়ে ইছামতি নদী বা খালে দেওয়া হবে যা এই সেচ প্রকল্পের প্রধান খাল হিসেবে ব্যবহার করা হবে। আবার বর্ষা মৌসুমে সেচ এলকায় অতিরিক্ত পানি নিস্কাষণ করে হুড়াসাগর নদীর মাধ্যমে যমুনায় প্রবাহিত করা হবে। ইছামতি থেকে নৌ-যান গুলি সরাসরি হুড়াসাগর যাওয়ার কোন সুবিধা ছিল না বিধায় নেভিগেশন লক নির্মাণ করা হয়েছে, যার সাহায্যে দুই পার্শ্বের দুই নদীর পানির লেভেলের পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও ছোটখাটো দেশী নৌকা এপার-ওপার করা যায়। বর্তমানে এই নদীর প্রবাহ খুবই কমে গিয়েছে। শুকনো মৌসুমে পানি প্রায় একেবারেই থাকে না। এ অবস্থা ভবিষ্যতে বেড়া সেচ প্রকল্পের সফল পরিচালনার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।

মহকুমার হিন্দু তীর্থ ও দর্শনীয় স্থান

সিরাজগঞ্জ থানা ঃ
১) শহরের উত্তরে যমুনা নদীর তীরে শ্মাশানঘাট ও মন্দির। এটা রোকনী পরিবারের পূর্বপুরুষ রাম রায়ের (প্রখ্যাত জমিদার) কীর্তি।
২) কালীবাড়ী রোডস্থিত প্রাচীন কালিবাড়ী। এখানে বিরাট কাষ্ঠ নির্মিত রথ ছিল। এখন জীর্ণদশা। এখান হতে রথযাত্রা ও উল্টোরথ পর্ব উদযাপিত হয়।
৩) দরগা রোডের মহাপ্রভুর আখড়া। জাকজমকপূর্ণভাবে এখনে বিভিন্ন পুজা উদযাপিত হয়।

কামারখন্দ থানা ঃ
১) ঝাঐলের বিখ্যাত গোষ্ঠ যাত্রা ও মেলা। এখানে একটি মন্দির ও মন্ডপ আছে। অবশ্য পূর্বের মত প্রভাব নাই। ঝাঐলের পাল জমিদারগণ বিখ্যাত। এরা রাজপুত বংশধর।

উল্লাপাড়া থানাঃ
১) হাটীকুমরুল ইউনিয়নস্থিত হাটিকুমরুলের নবরত্ন, সোধ ও মন্দির, কালের করাল গ্রাসে নিষ্পেষিত হয়ে এখন নিষ্প্রভ। ইতিহাস বিখ্যাত নবরত্ন মন্দির এখন উপেক্ষিত অথচ উৎকৃষ্ট স্থাপত্য শিল্পের নির্দশন। এটি ছিল লাহিড়ী জমিদারগণের বাসস্থান যা নাটোর রাজের সাথে সম্পর্কিত।
২) রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়ন মধ্যস্থ চৈত্রহাটি কালিবাড়ী ইতিহাস প্রসিদ্ধ। রাজা চৌচির সিংহের বাসস্থান ও র্কীতি। এটা এখন নামেই পর্যবসিত তবু তীর্থ স্থান রূপে গণ্য।

শাহজাদপুর থানাঃ
১)শাহজাদপুর থানার গাঁড়াদহ ইউনিয়নের তারা বাড়িয়ার নিকট পূণ্যতোয়া করতোয়া নদীতে চৈত্রমাসের পূর্ণিমা তিথির পূর্বে অষ্টমী তিথিতে এখানে ‘গঙ্গা স্নানে’ ভীড় জমে।

তাড়াশ থানাঃ
১) নওগাঁ ও তাড়াশে হিন্দু কীর্তি থাকায় উভয় স্থান তীর্থ ক্ষেত্র রূপে পরিগণিত হয়। তাড়াশে বহু দর্শনীয় স্থান, মন্দিরাদি এখনও বর্তমান। সবই প্রাচীন কীর্তি ও ঐশ্বর্য্যমন্ডিত।
২) বারুহাস গ্রামের ভদ্রাবতী নদীতে পূর্বে চৈত্র পূর্ণিমার দিন গঙ্গাস্নান হত ও মেলা বসত। এখন ঐ সময় খাল শুকিয়ে যাওয়ায় স্নান পর্ব হয় না। কিন্তু তিথি উপলক্ষে মেলা বসে। অবশ্য এখন তা ভিন্নরূপ ধারণ করেছে।
৩) তালম গ্রামে সুউচ্চ টিলায় শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠিত, প্রাচীনতম কীর্তি। পূর্বে যতটা জন সমাগম হত, এখন তা হয় না তবুও বিখ্যাত।

ইলিয়ট ব্রীজঃ

ইলিয়ট ব্রিজ সিরাজগঞ্জ শহরের কাটা খালের উপরে লোহা ও সিমেন্টের সমন্বয়ে তৈরী। সিরাজগঞ্জ শহরকে দেখার জন্য কাঁটাখালের উপরে প্রায় ৩০ ফুট উঁচু করে ইংরেজ এসডিও মিঃ বিটসন বেল আই, সি, এস, সাহেব ১৮৯৫ সনে ৪৫,০০০ টাকা খরচ করে বাংলার তৎকালিন ছোট লাট স্যার আল ফ্রেড ইলিয়ট সাহেবের নামানুসারে এই ব্রিজ তৈরী করেছিলেন।

সে আমলে সন্ধ্যার পর ইলিয়ট ব্রিজের উপরে দাঁড়িয়ে সিরাজগঞ্জ শহরের একটি ভিন্নতর রূপ নজরে পড়তো। বর্তমানে উজ্জল নিয়ন বাতির আলোকমালায় সিরাজগঞ্জের প্রতিটি সড়ক পথ শুধু উদ্ভাসিত নয়; সেই সাথে দোকানের রডলাইট ও হেড লাইটের আলো রাতের অন্ধকারকে দূরে সরিয়ে রাখে। তখন ইলিয়ট ব্রিজের উপর দাঁড়িয়ে তাকিয়ে থাকলে দেখা যেত ঘন অন্ধকারের মধ্যে আশপাশের কোনো অসিত্বই নাই। দিনের বেলায় দেখা গেছে, শহর থেকে অনেক দূরে অসংখ্য গ্রাম জনপদ গা-ঘেষাঘেষি করে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু রাত্রিবেলায় সেই ইলিয়ট ব্রিজের উপর সেই একই জায়গায় দাঁড়ালে মনে হতো, বিশ্বচরাচরে আর কোথাও কোন কিছুর অসিত্ব নাই। শুধু ইলিয়ট ব্রিজের দু’পাশে, উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব পশ্চিমে এক মাইল পরিসর এলাকাতেই সমস্ত দেশটা এসে ভীড় জমিয়েছে।

শাহজাদপুর মসজিদঃ
সিরাজগঞ্জ জেলার অন্তর্গত শাহজাদপুর সদরের একেবারে শেষপ্রান্তস্থিত দরগাপাড়ায় হুড়াসাগর নদীর পারে অবস্থিত। বিশ্বাস করা হয় যে, ১৫ শতকে প্রখ্যাত সুফিসাধক মখদুম শাহ এ মসজিদ নির্মাণ করেন। কোন লিপি প্রমাণে এ তারিখ নির্নয় করা হয়নি। মসজিদের স্থাপত্যরীতি ও অলংকরণ শৈলী হিসেবে মসজিদটি ১৫ শতকে নির্মিত হয়েছিল। বহুগম্বুজ বিশিষ্ট আয়তাকার মসজিদের গোত্রভূক্ত। শাহজাদপুর মসজিদ তিন সারিতে পাঁচটি করে মোট পনেরটি গম্বুজ দ্বারা আচ্ছাদিত। মসজিদটির উত্তর দক্ষিণে দৈর্ঘ্য ১৯.১৩ মিটার এবং পূর্ব পশ্চিমে প্রস্থ ১২.৬০ মিটার। অভ্যন্তরভাগে এর দৈঘ্য ও প্রস্থ যথাক্রমে ১৫.৭৭ মিটার ও ৯.৬০ মিটার এবং দেওয়াল ১.৫৭ মিটার পুরু। এ মসজিদটি কিবলা কোঠা দেওয়ালের লম্বে, পাঁচটি স্তম্ভপথে (‘বে’) এবং উত্তর-দক্ষিণে তিনটি স্তম্ভপথে আইল বিভক্ত হয়ে মোট পনেরটি চতুস্কোনাকার এলাকায় বিভক্ত হয়েছে। বাংলাদেশের অবস্থিত অন্যতম প্রাচীন এ মসজিদে প্রাথমিক সুলাতানি আমলে বিকশিত মসজিদ স্থাপত্যরীতির সকল বৈষ্ট্যই পরিলক্ষিত হয়।

জয়সাগর দিঘী
সিরাজগঞ্জ জেলার রায়গঞ্জ উপজেলাধীন সোনাখাড়া ইউনিয়নের নিমগাছি বাজার হতে প্রায় ১ কিঃ মিঃ পশ্চিমে এ বিশাল ও প্রখ্যাত দিঘীটির অবস্থান। ঢাকা- বগুড়া মহাসড়কের ভূইয়াগাঁতী নামক স্থান হতে তাড়াশ অভিমুখী রাস্তার পাশে অবস্থিত। এ দিঘী সংলগ্ন উদয় দিঘী/কাতলা দিঘীসহ আরও কয়েকটি দিঘী রয়েছে। জয়সাগর দিঘীর বিশাল জলাধার ছাড়াও পর্যটকদের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলার নিমিত্ত পর্যাপ্ত জায়গা রয়েছে। জনশ্রুতি আছে বিরাট রাজার আমলে প্রজাদের জলকষ্ট নিবারণ ও রাজার নিজস্ব লক্ষাধিক গবাদি পশুর পানীয় জলের
জন্য এই দিঘীগুলো খনন করা হয়। ঐতিহাসিকগণের মতে পাল সাম্রাজ্যের রাজা ২য় গোপালের শাসনামলে (৯৪০-৯৬০ খ্রিঃ) জয়সাগর দিঘী খনন করা হয় (ডঃ রমেশ চন্দ্র মজুমদার ইতিহাস ১ম খন্ড পৃঃ ৫৭)। বর্তমানে এ দিঘীসহ অনেকগুলো দিঘী নিয়ে জয়সাগর মৎস্য খামার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। গ্রামীণ ব্যাংকের নিকট ২৫ বৎসর মেয়াদে এ দিঘীগুলো ইজারা বন্দোবস্ত দেয়া আছে। ইজারার মেয়াদ প্রায় শেষ পর্যায়ে।

পোতাজিয়া নবরত্ন মন্দির
শাহজাদপুর সদর থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার পশ্চিমে রয়েছে একটি প্রাচীন মন্দির। ১৭০০ খ্রিষ্টাব্দে নির্মিত এই মন্দিরটি ‘নবরত্ন মন্দির’ নামে পরিচিত। তিনস্তর বিশিষ্ট মন্দিরটি মধ্য যুগের হিন্দু স্থাপত্য শিল্পের অপূর্ব নিদর্শন। (শাহজাদপুরের ইতিহাস—– প্রাগুক্ত)। এই মন্দিরটির দিকে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের নজর দেয়া খুবই জরুরি।

উল্লাপাড়া উপজেলাধীন হাটিকুমরুল ইউনিয়নের নবরত্নপাড়া গ্রামে নবরত্ন মন্দির নামে একটি পুরার্কীতি আছে। এর আশপাশে আরো কয়েকটি ছোট ছোট মন্দির রয়েছে। এ মন্দিরগুলো আনুমানিক ১৭০৪-১৭২০ সালের মধ্যে নবাব মুর্শিদকুলি খানের শাসনামলে তার জনৈক নায়েব দেওয়ান রামনাথ ভাদুরী নামক ব্যক্তি স্থাপন করেন। মূল মন্দিরটি তিনতলা বিশিষ্ট এবং অন্যান্য মন্দির সমূহ দোচালা এবং মঠাকৃতি আটকোনা বিশিষ্ট। এ মন্দির নির্মাণকালে প্রতিটি ইট ঘিয়ে ভেজে তৈরী করা হয়েছিল মর্মে জনশ্রুতি রয়েছে। নবরত্ন মন্দিরটি ১৯৮৭ সালে সংরক্ষিত ইমারত হিসেবে সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ গ্রহণ করে কিছু সংস্কার সাধন করে। এ ছাড়াও সম্প্রতি ঐ স্থানের মন্দিরসমূহের সংস্কার সাধন করা হয়েছে। আলোচ্য নবরত্ন মন্দির ও আশপাশের অন্যান্য মন্দিরের প্রকৃত অবয়ব অনেকাংশে ধবংস প্রাপ্ত হলেও এর গঠন আকৃতি ও নির্মাণ শৈলী অভূতপূর্ব।

রাউতারা বাঁধ ও স্লুইচগেট
বাঘাবাড়ী মিল্কভিটা দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা থেকে নিমাইচরা পর্যন্ত যে বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধটি আছে সেটি ‘নিমাইচরা বাঁধ’ নামে পরিচিত। কিন্তু শাহজাদপুরের মানুষের কাছে এর নাম রাউতারা বাঁধ। এখানে উল্লেখ্য যে, নাটোরের বিখ্যাত সুবিশাল চলনবিলের দক্ষিণ পূর্বাংশ সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর উপজেলার পশ্চিমাংশ পর্যন্ত চলে এসেছে। শাহজাদপুরের এই অংশটি বর্ষাকালে বন্যার পানিতে সাগরের মতো অকূল পাথারে পরিণত হয়। এ কারণে এটি এলাকার মানুষের কাছে ‘পাথার’ অঞ্চল নামে পরিচিত। বর্ষার পানি নেমে যাওয়ার সাথে সাথে এ অঞ্চলে মাশকলাই এবং খেসারি ছিটিয়ে দেয়া হয়। এগুলো প্রধানত গো খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

শীতকালে কৃষকরা এই বাথানে গরু রেখে ঘাস খাওয়ায়। এই বিশাল গোচারণভূমিটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর জমিদারী থেকে দান করেছিলেন। এখন এসব সম্পত্তি নানাভাবে ভূমিদস্যুরা গ্রাস করে ফেলার কারণে রবীন্দ্রনাথের দান করা এই লাখেরাজ গোচারণ ক্ষেত্রটি প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। বর্তমানে ইরিধান আবাদের প্রচলনের ফলে এখানে শুধু একটি মাত্র ফসল, ধানের আবাদ হচ্ছে। তাও অনেক সময় রাউতারা স্লুইচগেট সংলগ্ন বাঁধ ভেঙ্গে অকালে পানি এসে রাতারাতি কাঁচা পাকা সব ধান তলিয়ে যায়। ফলে কৃষকরা সর্বহারা হয়। চীনের হোয়াংহো নদীকে একসময় চীনের দুঃখ বলা হতো। এই বাঁধটিও এলাকার মানুষের সেই রকম দুঃখের কারণ হয়ে আছে। এর কারণ হিসেবে ভুক্তভোগীরা বলছেন, এখানে (রাউতারাতে) যে স্লুইচগেটটি আছে তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই ছোট। এখন যে পরিসরে আছে তারচেয়ে ৮/১০ গুণ বড় এবং আধুনিক স্লুইচগেট প্রয়োজন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, পাবনা জেলার বেড়া উপজেলায় যে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও স্লুইচগেট আছে সে রকম রাউতারাতেও একটি প্রকল্প গ্রহণ করা প্রয়োজন। রাউতারা বাঁধের এলাকাটি পোতাজিয়া ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত। এই বাঁধ ও স্লুইচগেটটি নির্মাণ করা হলে পাবনা জেলার বিশাল একটি অংশসহ শাহজাদপুরের এই অঞ্চলের ২/৩ লক্ষ একর জমির ফসল রক্ষা পাবে। তখন কৃষকরা এই জমি থেকে বছরে দু’বার ধান এবং এক বার রবিশস্যের আবাদ করে মোট তিনটি মৌসুমেই ফসল পাবে।

সদর উপজেলায় মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি চিহ্ন হিসেবে চন্ডিদাসগাঁতী গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে ‘দুর্জয়’ নামে ১টি ভাষ্কর্য রয়েছে। উল্লাপাড়ার ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো মক্কাউলিয়া মসজিদ (দারোগাপাড়া পঞ্চদশ শতাব্দী), হযরত বাগদাদী (রঃ) এর মাজার শরীফ (গয়হাট্টা), পাঁচ পীরের মাজার (আঙ্গারু), চৈত্রহাটির প্রত্নতাত্তিক স্থাপনা। তাড়াশ উপজেলায় অবস্থিত বেহুলার বাড়ি ও কুয়া, হযরত শাহ শরীফ জিক্টদানী (রাঃ)-এর মাজার এবং শিব মন্দির উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক স্থাপনা। তাড়াশ উপজেলার নওগাঁ ইউনিয়নে হযরত শাহ শরীফ জিন্দানী (রঃ) এর মাজার শরীফ অবস্থিত। প্রতি বৎসর ৩দিন ব্যাপী বাৎসরিক ওরস শরীফে প্রায় ৩ লক্ষাধিক লোকের সমাগম হয়ে থাকে। তাড়াশ উপজেলার বারুহাস ইউনিয়নের বিনসারা গ্রামে কিংবদন্তী লোক কাহিনীর বেহুলার বাড়ী অবস্থিত। বর্তমানে বেহুলার কুপ নামে একটি ইন্দারা আছে। ইন্দারাটি ঐতিহাসিক স্থাপনা হিসেবে সংরক্ষণ করা যেতে পারে।

তাঁত শিল্প
বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতিতে তাঁত শিল্পের ভূমিকা অপরিসীম। হস্ত চালিত তাঁতে বছরে প্রায় ৭০ কোটি মিটার বস্ত্র উৎপাদিত হয় যা অভ্যন্তরীণ চাহিদার প্রায় ৪০ ভাগ মিটিয়ে থাকে। এ শিল্প থেকে মূল্য সংযোজন করের পরিমাণ প্রায় ১৫০০.০০ কোটি টাকা। বাংলাদেশের হস্ত চালিত তাঁত শিল্প এদেশের সর্ববৃহৎ কুটির শিল্প। সরকার কর্তৃক সম্পাদিত তাঁত শুমারী ২০০৩ অনুযায়ী দেশে বর্তমানে ৫ লক্ষাধিক হস্তচালিত তাঁত রয়েছে তন্মধ্যে সিরাজগঞ্জ জেলাতে রয়েছে ১ লক্ষ ৩৫ হাজারের অধিক। মহিলাদের অংশগ্রহণ সহ গ্রামীণ কর্মসংস্থানের দিক থেকে এর স্থান কৃষির পরে দ্বিতীয় বৃহত্তম। দেশের প্রায় ১৫ লক্ষ লোক পেশার ভিত্তিতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এ শিল্পের সাথে জড়িত।

ছয় আনি পাড়া দুই গম্বুজ মসজিদ
শাহজাদপুরের ছয় আনি পাড়ায় রয়েছে পঞ্চদশ শতাব্দীতে নির্মিত দুই গম্বুজ বিশিষ্ট একটি মসজিদ। ‘স্থাপত্য শিল্পের দিক থেকে এর রয়েছে ভিন্ন মাত্রিক গৌরব। কারণ পঞ্চদশ শতাব্দীতে দুই গম্বুজওয়ালা মসজিদ বাংলার আর কোথাও নির্মিত হয়েছে বলে জানা যায় না’’ (শাহজাদপুরের ইতিহাস—- প্রাগুক্ত)। তাই এই মসজিদটির সংস্কার, রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়নের জন্য সরকারের নজর দেয়া প্রয়োজন বলে এলাকাবাসীর দাবি।

(সিরাজগঞ্জের এই বিশেষ লেখাটি জেলা তথ্য বাতায়ন থেকে নেওয়া)

আমাদের ঐতিহ্য

সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলায় বঙ্গবন্ধু যমুনা বহুমূখী সেতু, হার্ডপয়েন্ট, রাণীগ্রাম গ্রোয়েন, কাঁটাখাল, ইলিয়ট ব্রীজ জেলার ঐতিহ্য বহন করে চলেছে। বঙ্গবন্ধু যমুনা বহুমূখী সেতুর (বাংলাদেশের বৃহত্তম সড়ক ও রেলসেতু) পাশাপাশি সয়দাবাদ ইউনিয়নে বঙ্গবন্ধু যমুনা বহুমূখী সেতু সংলগ্ন একটি ‘ইকোপার্ক’ প্রতিষ্ঠা করা হলেও জনগণের চাহিদানুযায়ী এখনও গড়ে উঠেনি। পরিপূর্ণভাবে গড়ে উঠলে দেশী-বিদেশী পর্যটকদের ব্যাপক সমাগম ঘটবে মর্মে আশা করা যায়। এছাড়া পৌর এলাকার হার্ডপয়েন্টে একটি পার্ক তৈরী করা হয়েছে। আবাসনের জন্য ইতোমধ্যেই শহর এলাকায় গড়ে উঠেছে দু’তিনটি উন্নতমানের আবাসিক হোটেল। উল্লাপাড়ার ঘাটিনা ব্রীজ সংলগ্ন এলাকায় প্রতিদিন বিকেলে আনন্দ ভ্রমণের জন্য লোকজন জড়ো হয়। এছাড়া বর্ষাকালে চলনবিল বেষ্টিত মোহনপুর, উধুনিয়া, বড়পাঙ্গাসী ও বাঙ্গালা ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ অঞ্চল নয়নাভিরাম শোভা ধারণ করে। সুফি সাধক শাহ কামাল (রহঃ) ধর্ম প্রচারের জন্য কামারখন্দে আসেন এবং তিনি ভদ্রঘাট ইউনিয়নের নান্দিনা কামালিয়া গ্রামে মৃত্যু বরণ করেন। তাঁর কবরকে ঘিরে তৈরী  হয়েছে মাজার শরীফ। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ এ মাজার দর্শনে আসেন।

উল্লেখযোগ্য পর্যটন স্থানগুলো হলোঃ

বঙ্গবন্ধু যমুনা বহুমূখী সেতু
এটি বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার দীর্ঘতম এবং বিশ্বের ১২তম দীর্ঘ সেতু। ১৯৯৮ সালের জুন মাসে এটি উদ্বোধন করা হয়। বাংলাদেশের ৩টি বড় নদীর মধ্যে সবচেয়ে বৃহত্তম এবং পানি নির্গমনের দিক থেকে  বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম নদী যমুনার উপর এটি নির্মিত হয়েছে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান এর নামানুসারে সেতুটির নামকরণ করা হয়। বঙ্গবন্ধু সেতু বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে দুই অংশকে একত্রিত করেছে। এই সেতু নির্মাণের ফলে জনগণ বহুভাবে লাভবান হচ্ছে এবং এটি আন্তঃআঞ্চলিক ব্যবসায় ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। সড়ক ও রেলপথে দ্রুত যাত্রী ও মালামাল পরিবহন ছাড়াও এই সেতু বিদ্যুৎ ও প্রাকৃতিক গ্যাস সঞ্চালন এবং টেলিযোগাযোগ সমন্বিত করার অপূর্ব সুযোগ করে দিয়েছে।

হার্ডপয়েন্ট
সিরাজগঞ্জ জেলা যমুনা নদীর তীরে অবস্থিত। প্রতি বছর যমুনার অব্যহত ভাঙ্গনের ফলে শহরটি ধীরে ধীরে পশ্চিম দিকে স্থানান্তরিত হয়। প্রতি বছরের ভাঙ্গনের ফলে সরকার ১৯৯৬ সালে ৪৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৩ কিলোমিটার শহর রক্ষা বাধ নির্মাণ করেন। ফলে বর্তমানে শহর যমুনা নদীর ভাঙ্গনের হাত থেকে অনেকটা নিরাপদ হয়েছে। সেই সাথে অভাবিত ভাবে এই হার্ডপয়েন্টটি একটি পর্যটনের স্থান হিসেবে যথেষ্ট ভূমিকা রাখছে।প্রতি দিন দূর-দূরান্ত থেকে বহু ভ্রমণ পিপাসু মানুষ এই স্থানটি ভ্রমণ করে থাকেন। বর্ষা মৌসুমে এই স্থানটি খুবই আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। এখানে দাঁড়ালে যমুনা নদীর পূর্ণরূপ পর্যবেক্ষণ করা যায়। তাছাড়া এখান থেকে যমুনা বহুমূখী সেতুর নান্দনিক দৃশ্য উপভোগ করা যায়।

মখদুম শাহের মাজারঃ
বাংলার আউলিয়া-দরবেশের মধ্যে মখদুম শাহ খুবই পরিচিতি ও শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিত্ব। সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুরে পুরানো শাহী মসজিদের পাশ্ববর্তী কবরস্থানে তিনি শায়িত আছেন। স্থাপত্য রীতির বিবেচনায় বলা যায় যে, শাহজাদপুর মসজিদটি মুঘলপূর্ব যুগে নির্মিত। মসজিদটির গাত্রে কোন অভিলেখ না থাকায় এর নির্মাণ তারিখ নিশ্চিতভাবে বলা যাবে না। এ কারণে এবং লিখিত সাক্ষ্যের অনুপস্থিতিতে দরবেশ মখদুম শাহ এর পরিচিতি ও ইতিহাস সঠিক ভিত্তির উপর দাঁড় করানো সম্ভব নয়। এতদঞ্চলে প্রচলিত জনশ্রুতিই মখদুম শাহ সমন্ধে জানার একমাত্র উৎস। প্রায় একশত বছর পূর্বে এ কাহিনী সংগ্রহ করে কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটি পত্রিকায় প্রকাশ করা হয়। প্রচলিত কাহিনী অনুযায়ী ইয়েমেনের জনৈক রাজা মুয়াজ বিন জবলের এক কন্যা ও দুই পুত্রের একজন ছিলেন মখদুম শাহ দৌলাহ। পিতার অনুমতি নিয়ে তিনি নিজে এবং আরও বারোজন আউলিয়াসহ বিধর্মীদের দেশে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে বের হন। এছাড়া স্বীয় বোন এবং খাজা কালাম দানিশমন্দ, খাজা নুর ও খাজা আনোয়ার নামে তাঁর তিন ভাগনে তাঁর সঙ্গী হয়েছিলেন। পথিমধ্যে বোখারাত শেক জালালুদ্দীন বোখারীর সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। শুভেচ্ছার নিদর্শন স্বরূপ তিনি মখদুম শাহকে ধুসর রঙের এক জোড়া কবুতর উপহার দেন। বোখারা থেকে দলটি বাংলা অভিমুখে যাত্রা করে। তিনি দলবলসহ বাংলায় এসে জনৈক হিন্দু রাজার শাসনাধীন শাহজাদপুর নামক লোকালয়ে বসবাস শুরু করেন। ঐ রাজার রাজ্য বিহার পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। মখদুম শাহ ও তাঁর অনুসারীদের উৎখাত করার জন্য রাজা আদেশ দেন। ফলে দু’দলের মধ্যে তীব্র যুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধে খাজা নুর ব্যতীত মখদুম শাহ ও তাঁর অন্যান্য সাথী শাহাদত বরণ করেন। এ বিষাদময় ঘটনা থেকে পরিত্রাণ পেয়ে পরবর্তী সময়ে খাজা নুর সোনারগাঁও এর এক রাজকুমারীকে বিয়ে করেন। শাহজাদপুর পরিবার যারা মখদুম শাহ দৌলার বংশ বলে দাবি করে আসছে, তারা সম্ভবত খাজা নুর ও সোনাগাঁয়ের রাজকুমারীর বংশধর।

মখদুম শাহ দৌলাহ যে পরিবেষ্টিত প্রাঙ্গণে শায়িত আছেন ঠিক সেখানে শাহ ইউসুখের সামাধি সৌধ অবস্থিত। মখদুম শাহের অন্যান্য অনুসারীদের পাশে একটি আঙ্গিনায় কবর দেওয়া হয়। শামসুদ্দীন তাব্রিজিকে (প্রখ্যাত ‘মসনভি’ রচয়িতা মেশ জালালুদ্দীন রুমির শিক্ষক শামসুদ্দীন তাব্রিজি নন। তিনি কখনও বাংলায় এসেছেন বলে জানা যায় না) শাহ দৌলাহ শহীদের অনুসারী বলে ধরা হয়। পৃথক অন্য একটি আঙ্গিনায় শামসুদ্দীন তাব্রিজি শায়িত আছেন। অন্যান্যরা যাঁদেরকে মখদুম শাহীর অনুসারি ধরা হয় এবং যাঁদের সমাধি একই অঙ্গিনায় অবস্থিত তাঁরা হলেন শাহ খিনগার, শাহ আজমল, হাসিল পীর , শাহ বোদলা, শাহ আহমদ এবং শাহ মাহমুদ। তাঁর অন্যান্য কিছু সহচরদের গণকবর দেওয়া হয় এবং তা গঞ্জ-ই-শাহীদান নামে পরিচিত। মখদুম শাহের বোন নিকটবর্তী নদীতে ঝাপ দিয়ে আত্নহত্যা করেন এবং ঐ জায়গাটি এখনও ‘সতীবিবির ঘাট’ নামে পরিচিত। যেহেতু মখদুম শাহ ইয়েমেনের রাজ্যের শাহজাদা নামে পরিচিত, তাই তাঁর নামানুসারে স্থানাটির নামকরণ করা হয় শাহজাদপুর। মুসলিম আমলে শাহজাদপুর পরগনা ইউসুফশাহীর অন্তর্ভুক্ত ছিল। ইউসুফ শাহ এর নামানুসারে এ পরগনার নামকরণ করা হয়। ৭২২ বিঘা জমি নিয়ে একটি বিরাট এস্টেট শাহজাদপুর দরগাহ ও মসজিদের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দান করা হয়। এ এস্টেট এখনও মখদুম শাহের ভাগনে খাজা নুরের বংশধরেরা ভোগ-দখল করছেন। মখদুম শাহ দৌলাহর বাংলায় আগমনের তারিখ নির্ণয় করা যায়নি। প্রচলিত কাহিনী অনুসারে, তুর্কি আক্রমনের পূর্বে দ্বাদশ শতাব্দীতে তিনি এবং তাঁর সহচরগণ বাংলায় আসেন বলে ইঙ্গিত পাওয়া যায়। অবশ্য আধুনিক পন্ডিতগণ এ ধারণার ব্যাপারে সন্দিহান । ইয়েমেনের সুলতান মুয়াজ বিন জবলকে সনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। এক মুয়াজ বিন জবল নবী হযরত মুহম্মদ (সঃ)-এর সাহাবি ছিলেন। তিনি ১৭ বা ১৮ হিজরিতে মারা যান। তাই নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, লোককাহিনীর মুয়াজ এবং মুহম্মদ (সঃ)-এর সাহাবি মুয়াজ কোনক্রমেই অভিন্ন ব্যক্তি নন। জালালউদ্দিন বোখারী, যাঁর সঙ্গে মখদুম শাহের দেখা হয়েছিল বলা হয় তিনি ১২৯১ সালে মৃত্যুবরণ করেন। অতএব, এ ব্যাপারে কালের পরিপ্রেক্ষিতে ধারণা করা হয় যে, মখদুম শাহ চতুর্দশ শতাব্দীর পূর্বে বাংলায় আসেননি এবং নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে, বখতিয়ারের বাংলা বিজয়ের পর তিনি এদেশে আসেন। শাহজাদপুর দরগাহে প্রতি বছর চৈত্র মাসে (মধ্য-এপ্রিল) এক মাসব্যাপী মেলা হয়। মেলার সময় এখানে সকল সম্প্রদায়ের লোকের সমাগম হয়। দরগায় উৎসর্গীকৃত সামগ্রীর মধ্যে চাল, চিনি, মিষ্টি, মোরগ এবং চেরাগ (এক ধরণের ব্রতমূলক বাতি) প্রধান।

রবীন্দ্র-কাচারিবাড়ি
শাহজাদপুরের আর একটি বিখ্যাত ও জনপ্রিয় পুরাকীর্তি হচ্ছে বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শাহজাদপুরের কাচারিবাড়ী। এটি রবীন্দ্রনাথের পৈতৃক জমিদারি তত্ত্বাবধানের কাচারি ছিল। তারও পূর্বে অষ্টাদশ শতাব্দীতে এটি নীলকরদের নীলকুঠি ছিল। সে কারনে এখনও অনেকে একে কুঠিবাড়ী বলে। পরে রবীন্দ্রনাথের দাদা প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর এটি নিলামে কিনে নেন। এখানে রয়েছে জমিদারির খাজনা আদায়ের কাচারির একটি ধ্বংসাবশেষ, একটি বেশ বড় দ্বিতল ভবন। বর্তমানে এখানে নির্মিত হয়েছে একটি আধুনিক অডিটোরিয়াম। দ্বিতল ভবনটি বর্তমানে রবীন্দ্র জাদুঘর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং আঙ্গিনার বিস্তৃত জায়গা জুড়ে তৈরী করা হয়েছে সুদৃশ্য একটি ফুলবাগান। রবীন্দ্রনাথ পিতার আদেশে ঊনত্রিশ বছর বয়সে ১৮৯০ সালে জমিদারি তত্ত্বাবধানের জন্য প্রথম শাহজদাপুর আসেন। রবীন্দ্রনাথ এখানকার প্রকৃতি ও মানুষের বিচিত্র জীবন প্রবাহের সৌন্দর্য দেখে অভিভূত হন।

আমাদের সিরাজগঞ্জ

সিরাজগঞ্জ জেলা ২৪০০’ – ২৪৪০’ পশ্চিম অক্ষাংশে এবং ৮৯২০’ – ৮৯৫০’ পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত । এ জেলার দক্ষিণে পাবনা, উত্তরে বগুড়া, পূর্বে টাঙ্গাইল ও জামালপুর, পশ্চিমে পাবনা, নাটোর ও বগুড়া জেলা অবস্থিত। এ জেলার আয়তন ২৪৯৭.৯২ ব: কি.মি.। তাঁত শিল্প এ জেলাকে বিশ্বের দরবারে পরিচিত করেছে। বঙ্গবন্ধু সেতু এবং সিরাজগঞ্জ শহররক্ষা বাঁধের অপূর্ব সৌন্দর্য এ জেলাকে পর্যটন সমৃদ্ধ জেলার খ্যাতি এনে দিয়েছে। তাছাড়া শাহজাদপুর উপজেলার রবীন্দ্র কাচারীবাড়ী, এনায়েতপূর খাজা ইউনুস আলী মেডিকেল কলেজ এ্যান্ড হাসপাতাল, মিল্কভিটা, বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিম প্রান্তের ইকোপার্ক, বাঘাবাড়ী বার্জ মাউনন্টেড বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, বাঘাবাড়ী নদী বন্দর ইত্যাদি বিখ্যাত স্থাপত্য ও শৈল্পকর্মের নিদর্শন এ জেলাকে সমৃদ্ধতর করেছে। বেলকুচি থানায় সিরাজউদ্দিন চৌধুরী নামক একজন ভূস্বামী (জমিদার) ছিলেন। তিনি তার নিজ মহালে একটি ‘গঞ্জ’ স্থাপন করেন। তার নামানুসারে এর নামকরণ করা হয় সিরাজগঞ্জ। তাঁর নামে নামকরণকৃত সিরাজগঞ্জ স্থানটি নদীভাঙ্গণে বিলীন হয়। পরবর্তীতে তিনি ভুতের দিয়ার মৌজা নিলামে খরিদ করেন। তিনি ভুতের দিয়ার মৌজাকেই নতুনভাবে ‘সিরাজগঞ্জ’ নামে নামকরণ করেন। ফলে ভুতের দিয়ার মৌজাই ‘সিরাজগঞ্জ’ নামে স্থায়ী রূপ লাভ করে। ভৌগোলিক কারণেই বন্যা, খরা, নদী ভাঙ্গনসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে এ জেলার জনসাধারণ জর্জরিত। এ সকল কারণে জনসংখ্যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ দরিদ্র ও বেকার। এ জেলার বেশিরভাগ লোক কৃষি ও তাঁত শিল্পের উপর নির্ভরশীল। তাছাড়া এ জেলার একটি উল্লেখযোগ্য জনগোষ্ঠী মৎস্য আহরণ করে জীবিকা নির্বাহ করে থাকে।

জেলার প্রথম অনলাইন সংবাদপত্র